প্রকাশিত: ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

পুনরায় একই স্থানে বহাল হয়ে অলৌকিক ক্ষমতা দেখালেন প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেন

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি : লক্ষ্মীপুর উন্নয়নকাজের বিল ছাড়াতে ‘৫ শতাংশ’ কমিশন আদায়, অসম্পূর্ণ ভবনে ৩৩ কোটি টাকার শতভাগ বিল পরিশোধ এবং সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অথচ শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বদলে অদৃশ্য ক্ষমতার জোরে মাত্র ২০ দিনের ব্যবধানে তিন উপজেলায় বদলি ও পুনরায় একই স্থানে বহাল হয়ে অলৌকিক ক্ষমতা দেখালেন লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেন।

স্থানীয় ঠিকাদারদের অভিযোগ, এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনকে ‘মোটা অঙ্কের উৎকোচ দিয়ে ম্যানেজ’ করেই বদলি আদেশ বাতিল করিয়ে স্বপদে বহাল হয়েছেন ইকবাল হোসেন।

দাপ্তরিক নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যেই গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেন স্বাক্ষরিত এক আদেশে (স্মারক নং-৯৫৩৫) ইকবাল হোসেনকে ফেনীর পরশুরাম উপজেলায় বদলি করা হয়। এর মাত্র এক সপ্তাহের মাথায় তাঁকে পরশুরাম থেকে সরিয়ে চন্দ্রগঞ্জ উপজেলার সহকারী প্রকৌশলী করা হয়। তবে এর ১০ দিনের মাথায় গতকাল ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রধান প্রকৌশলী বেলাল হোসেন নিজেই অপর এক অফিস আদেশে (স্মারক নং-১০১৪৭) পূর্বের বদলি বাতিল করে ইকবাল হোসেনকে পুনরায় লক্ষ্মীপুর সদরে বহাল করেন।

অপরদিকে, বরিশালের মুলাদী থেকে বদলি হয়ে আসা কর্মকর্তা জনাব মোঃ জিয়াউল হককে প্রথমে লক্ষ্মীপুর সদরে বদলি করা হলেও, তিনি একদিনের জন্যও অফিসে ঠিকমতো যোগদান বা কাজ করার সুযোগ পাননি। জিয়াউল হক দায়িত্ব নিতে এলে ইকবাল হোসেন তাঁর সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করে অফিস থেকে তাড়িয়ে দেন। পরবর্তীতে ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জারি করা নতুন অফিস আদেশে (স্মারক নং-১০১৪৬) পূর্বের সদর উপজেলার বদলি আদেশ সংশোধন করে জিয়াউল হককে চন্দ্রগঞ্জ উপজেলায় পাঠায় দপ্তর।

মূলত পিটিআই প্রকল্পের অসম্পূর্ণ কাজের বিপরীতে শতভাগ বিল দেওয়ার মহা-দুর্নীতি ধামাচাপা দিতেই ইকবাল হোসেন নতুন কর্মকর্তাকে বাধা দেন এবং সদরের পদ আঁকড়ে ধরেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

লক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) পাঁচতলা একাডেমিক ভবন ও মহিলা হোস্টেল নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগে কয়েকদিন যাবত লক্ষ্মীপুর জেলায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনগুলোর আস্তর, রং, টাইলস, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও আসবাবপত্রের কাজ এখনও অসম্পূর্ণ। অথচ মোট ৩৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা চুক্তিমূল্যের এই দুটি প্রকল্পে ইতোমধ্যে প্রায় ৩৩ কোটি ১৯ লাখ টাকার শতভাগ বিল ছাড় করা হয়েছে। কাজ শেষ না হতেই শতভাগ বিল নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন ঠিকাদার বেলাল হোসেন ও এলজিইডির জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী।

নির্মাণাধীন মসজিদ, পুকুর ঘাটলা, কালভার্ট ও গভীর নলকূপের বিল পাসের জন্য ৫ শতাংশ কমিশন আদায়ের অভিযোগে গত ১৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ এস এম মহসীনকে নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় (স্মারক নং-৭২৫৯)। তবে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই প্রশাসনিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করছেন অভিযুক্ত এই কর্মকর্তা। দপ্তরের কর্মচারীদের অভিযোগ, কথায় কথায় অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করায় পুরো অফিসে একধরনের জিম্মিদশা তৈরি হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার জানান, “প্রধান প্রকৌশলীকে ম্যানেজ করে ২০ দিনের মধ্যে ফিরে আসায় তিনি এখন আরও বেপরোয়া। দ্রুত তাঁর অপসারণ ও তদন্তের শাস্তি বাস্তবায়ন করা না হলে উপজেলার সমস্ত উন্নয়ন কাজ স্থবির হয়ে পড়বে।”এছাড়া সরকারি চাকরির বিধিমালা অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা নিজ জেলায় পদায়ন বা দায়িত্বে থাকতে পারেন না। কিন্তু ইকবাল হোসেনের নিজ বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার ৫নং চরপাতা ইউনিয়নের চরপাতা গ্রামে হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজ জেলা লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিধি লঙ্ঘন করে নিজ জেলায় বহাল থাকার কারণেই তিনি এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও ঠিকাদারদের ওপর দাপট দেখানোর সুযোগ পাচ্ছেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর লক্ষ্মীপুর জেলা সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, কাজ অসম্পূর্ণ রেখে শতভাগ বিল পরিশোধ ও কমিশন বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত সবার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রকৌশলী মো. ইকবাল হোসেনকে কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি, তার বেবহৃত দুটি ফোন বন্ধ রয়েছে।  এর আগে তিনি জানান, যে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে সে অপরাধী।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী মো. বেলাল হোসেনকে মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও কোনো সাড়া মেলেনি।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর