• ঢাকা
  • সোমবার, ১৫ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৯ জুলাই, ২০২৪
সর্বশেষ আপডেট : ৯ জুলাই, ২০২৪

বেগমগঞ্জ সেই বন কর্মকতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ, বোটম্যানের বদলি

উপজেলা প্রতিনিধি, সোনাইমুড়ী : বেগমগঞ্জ উপজেলার বন কর্মকর্তা এ এস এম সামছুদ্দিনের দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে সাম্প্রতি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক নোয়াখালীর কথা পত্রিকায়। এই বিষয়ে নোয়াখালী উপকূলীয় বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু ইউসুফ বেগমগঞ্জ উপজেলার বন কর্মকর্তা সামছুদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করেছেন। এছাড়া সামছুদ্দিনের ছোট ভাই প্রতিবন্ধী বোটম্যান মইন উদ্দিনকে সুবর্ণচর উপজেলায় বদলি করা হয়েছে।

দৈনিক নোয়াখালীর কথা পত্রিকায় ‘বন কর্মকর্তার সম্পদের পাহাড়’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ হয়। বিষয়টি নজরে আসে নোয়াখালী উপকূলীয় বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু ইউসুফের। বিষয়টি তদন্ত করার নির্দেশ দেন জেলা উপকূলীয় বন বিভাগের বন সংরক্ষণ কর্মকর্তা কাজী তারিকুল ইসলামকে। গত রবিবার (৭ জুলাই) সেই তদন্তের প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তারিকুল ইসলাম।

প্রতিবেদন হাতে পেয়ে ঐদিনই বন কর্মকর্তা সামছুদ্দিনের প্রতিবন্ধী ভাই মইন উদ্দিনকে জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি করা হয়। বন কর্মকর্তা সামছুদ্দিনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদনে উল্লেখিত বিভিন্ন তথ্যের সত্যতা পেয়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করেছেন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু ইউসুফ।

নোয়াখালী উপকূলীয় বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু ইউসুফ জানান, বন কর্মকর্তা সামছুদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখিত অভিযোগের বিষয়ে কাজ চলমান রয়েছে। তাকে বদলি করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে, ইতিমধ্যে একজন স্টাফকে বদলি করা হয়েছে। তার অবৈধ সম্পদের তথ্যের বিষয়ে উপরে জানানো হবে তারা বিষয়টি দেখবেন।

নোয়াখালী বন বিভাগের এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বন কর্মকর্তা সামছুদ্দিন দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে দাপটের সাথে জেলাতে চাকরি করছেন। কোন সাংবাদিক তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করলে বিভিন্ন ধরনের হুমকিধমকি, মামলা ও বিভিন্ন দপ্তরে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে হয়রানি করতে থাকেন। এই কারণে বন বিভাগের লোকজন স্থানীয় সাংবাদিকরা তার বিরুদ্ধে ভয়ে মুখ খুলতেন না। বর্তমানে তার অনিয়ম, দুর্নীতি ও সম্পদের পাহাড় নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় বিভিন্ন মহলে আলোচনা সমালোচনার ঝড় বইছে।

এ বিষয়ে বন কর্মকর্তা সামছুদ্দিনের বক্তব্য নিতে তার মুঠোফোনে কয়েকবার কল দিলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।

উল্লেখ্য, বেগমগঞ্জ উপজেলার বন কর্মকর্তা এ এস এম সামছুদ্দিন আহমেদ। ঘুরেফিরে নিজ জেলায় চাকরি করছেন ৩৫ বছর ধরে। উপজেলা বন কর্মকর্তা হয়ে কিনেছেন কয়েক কোটি টাকার জমি ও প্লট, তুলছেন ভবন, করেছেন সরকারি খাল দখল। নিজের নানা অপকর্ম চাপা রাখতে সামাজিক বনায়নের কমিটিতে রেখেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, ব্যবসায়ীসহ সমাজের সচ্ছল ব্যক্তিদের। বনায়নের উপকারভোগীদের অর্থ বিতরণের ক্ষেত্রেও করেন নয়-ছয়। নিজের মানসিক প্রতিবন্ধী ভাইকে উপজেলা বন অফিসের নৌকাচালক হিসেবে চাকরি দিয়ে বেতন তুলছেন নিজেই। এ ছাড়া নিজ এলাকার সংখালঘু সম্প্রদায়ের জমি জোর করে রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

সোনাইমুড়ী উপজেলার কালিকাপুর বাজার এলাকায় পৈতৃক ভিটা সামছুদ্দিনের। এলাকায় তাকে সবাই চেনে ‘বন সামছু’ নামেই। ১৯৯০ সাল থেকে কর্মরত আছেন জেলার বিভিন্ন উপজেলার বন কর্মকর্তা হিসেবে। বর্তমানে তিনি বেগমগঞ্জ উপজেলার বন কর্মকর্তার পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত হিসেবে রয়েছেন সোনাইমুড়ী ও সেনবাগের বন কর্মকর্তার দায়িত্বে। দীর্ঘ চাকরি জীবনে কখনো সোনাইমুড়ী, কখনো সেনবাগ, কখনো বেগমগঞ্জ উপজেলার বন কর্মকর্তা হিসেবে সময় পার করেছেন। সাধারণত সরকারি কর্মকর্তাদের নিজ জেলায় চাকরির সুযোগ না থাকলেও সামছুদ্দিনের বেলায় যেন ভিন্ন নিয়ম।

অনুসন্ধানে জানা যায়, একজন উপজেলা বন কর্মকর্তার মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা। অন্যান্য ভাতা মিলিয়ে তা দাঁড়ায় সর্বোচ্চ ৩৭ হাজার। এই বেতনেই সামছুদ্দিন নিজ এলাকা কালিকাপুরে কিনেছেন ২২ ডিসিম জমি। বগাদিয়া-কালিকাপুর বাজার-সংলগ্ন সড়কের পাশে কিনেছেন প্রায় ৩০ ডিসিম জমি, যার বর্তমান মূল্য কয়েক কোটি টাকা। সেই জমির রাস্তা তৈরি করতে করেছেন সরকারি খাল দখল। কালিকাপুরের পৈতৃক জমিতে তুলছেন আলিশান দ্বিতল ভবন। বসবাস করছেন মাইজদী শহরের দীঘিরপাড় আবাসিক এলাকার বিলাসবহুল আপন নিবাস নামে একটি ফ্ল্যাটে। আর সেই ফ্ল্যাটের পাশেই কিনেছেন কয়েক কোটি টাকা মূল্যের প্লট। তবে ওই জমিতে ব্যবহার করেছেন নিজের শ্বশুরের নামে ব্যানার।

দীর্ঘ ২৫ বছর পূর্বে বেগমগঞ্জ বন কর্মকর্তা সামছুদ্দিনের শারীরিক প্রতিবন্ধী ভাই মহিউদ্দি নকে বেগমগঞ্জ বন বিভাগের বোটম্যান হিসেবে চাকরি দেন। তবে তিনি চাকরি করেন না। বাড়িতে থেকেই বন কর্মকর্তা শামসুদ্দিনের জমিতে চাষাবাদ করেন। বন বিভাগের কেউ তাকে কখনো অফিসে আসতে দেখেননি। কিংবা চাকরি করতে দেখেনি। প্রতিমাসে তার বেতন ও অন্যান্য ভাতা সহ ৩০ হাজার টাকা উত্তোলন করেন তার সহোদর ও বেগমগঞ্জ বন কর্মকর্তা শামসুদ্দিন।

সোনাইমুড়ী উপজেলা গঠিত হওয়ার পর থেকে বন কর্মকর্তা শামসুদ্দিন ওই উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে আসছে। এই দুই উপজেলায় বনায়ন ও উপকারভোগী সদস্যদের দলিল এবং নামের তালিকা প্রদান করেননি কখনো। বনায়ন অথবা বাগান মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে নিজের মনমত উপকারভোগীদের নামের তালিকা জেলা অফিসে পাঠান। এই তালিকায় স্থান পায় নিজের আত্মীয় ও প্রভাবশালী মহলের। সেনবাগ, সোনাইমুড়ী ও বেগমগঞ্জ উপজেলায় কোন কর্মকর্তার পোস্টিং হলে তাদের সাথে বিভিন্ন ধরনের হয়রানি করতে থাকে। একপর্যায়ে তারা এখান থেকে চলে যেতে বাধ্য হন। এ সুযোগে পরে তিনি পুনরায় অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১২ সালে সোনাইমুড়ী বন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান ইউসুফ। তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে না দেওয়ায় তিনি রামগঞ্জ উপজেলায় যোগদান করেন। বর্তমান সোনাইমুড়ী উপজেলার বন কর্মকর্তা শামসুল কবির চিকিৎসার জন্য এক মাসের ছুটিতে ভারতে যান। চিকিৎসা শেষে কর্মস্থালে যোগদান করতে চাইলে বেগমগঞ্জ কর্মকর্তা শামসুদ্দিন দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে ঘড়িমসি করেন। বিভিন্ন চাপে পরে পাঁচ মাস পর দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। দীর্ঘ চাকরির জীবনে বেগমগঞ্জ সোনাইমুড়ী সেনবাগ এই তিন উপজেলায় সরকারি ভাবে নিলামে গাছ টেন্ডার নিজের মাধ্যমে দাখিল করতেন। পরে নিজেই লট গুলো বিক্রি করতেন।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর