
রাশেদুল ইসলাম : জেলার সুবর্ণচর উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোনো কোনো জায়গায় কিছু কিছু খেজুর গাছ থাকলেও বেশিরভাগ এলাকায় আগের মতো নেই খেজুর গাছ। যেসব স্থানগুলোয় এক সময় রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে অসংখ্য খেজুর গাছ ছিল সেসব স্থান এখন গাছশূন্য। গ্রামের কোনো কোনো সড়কের পাশে কিছু গাছ থাকলেও তাতে তেমন রস হয় না বলে জানান স্থানীয়রা।
কাকডাকা ভোরে খেজুরের রস, মন মাতানো ঘ্রাণ গ্রামীণ সুবর্ণচরের জনপদে এখন তা বিরল। শীতের সকালে খেজুর রস, খেজুর গুঁড়ের মোয়া, হরেকরকম পিঠা সাথে মিষ্টি রোদ, কৃষক-কৃষাণির হাসিতে দারুণ প্রাণশক্তি ছিল। কিন্তু বিলুপ্তির পথে গ্রামীণ এই ঐতিহ্য খেজুর গাছ ও খেজুরের রস।
এক সময় শীতের আগমনের শুরুতেই গ্রামীণ সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয় খেজুর গাছ হতে রস সংগ্রহের চিত্র। কিন্তু কালের বিবর্তনে গ্রামে এখন শহুরে ছোঁয়া। শহরায়নের আগ্রাসনে প্রকৃতির ঐতিহ্য খেজুর গাছ হারিয়ে যাচ্ছে। দিন যত যাচ্ছে খেজুর গাছও তত কমছে।
এর মধ্যে সুবর্ণচর উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে কিছুসংখ্যক খেজুর গাছ দেখা মিললেও মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের চরখন্দকার কাটাখালী ঘাটের উত্তর পাশে এক সারিতে রয়েছে ২০টির মতো খেজুর গাছ। যা থেকে নিয়মিত রস সংগ্রহ করেন এক গাছি। তাছাড়া তার পুরো বাড়িতে রয়েছে প্রায় ৫০টির মতো খেজুর গাছ। যা এ এলাকার মধ্যে অন্য কোথাও নেই। বর্তমানে রসের চাহিদা থাকায় রস বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন এই গাছি।
জানা গেছে, শীতের শুরুতেই রস সংগ্রহের জন্য কাটা হয় খেজুর গাছ। গাছের অগ্রভাগের একপাশে বেশ খানিকটা কেটে পরিষ্কার করা হয়। পরে বাঁশের কঞ্চি কেটে কাঠি তৈরি করে গেঁথে দেওয়া হয়। তার ঠিক নিচেই ঝোলানো হয় মাটির হাঁড়ি। গাছের কাটা অংশ বেয়ে রস কাঠির মাধ্যমে ফোঁটায় ফোঁটায় হাঁড়িতে এসে জমা হয়। ঠাণ্ডা আবহাওয়া, মেঘলা আকাশ আর কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল পর্যাপ্ত রসের জন্য উপযোগী। এ সময়ে প্রাপ্ত রসের স্বাদও ভালো থাকে।
একসময় গ্রামীণ জনপদে খেজুর রস নিয়ে পায়েস পিঠার উৎসব, গভীর রাতে হাঁড়ি থেকে চুরি করে রস খাওয়া অনেকের শৈশবের স্মৃতি অম্লান হয়ে আছে আজো। গ্রামীণ মেঠোপথ আর খেজুর গাছের সারি আর গাছে রসের হাঁড়ি আজ আর দেখা মিলে না। দেখা মিলে না পাখি আর কীট-পতঙ্গের গাছে গাছে ঘুরে রস খাওয়ার দৃশ্য।
খেজুর গাছ বিলুপ্তির কারণ হিসেবে জানা গেছে বিভিন্ন কারণে খেজুর গাছ কর্তন, মরে যাওয়া, তদারকির অভাব এবং নতুন চারা রোপণ না করা।
গাছ কমলেও কমেনি খেজুর রসের গ্রাহক সংখ্যা। কমেনি এর কদরও। ঐতিহ্যবাহী কিছু গাছের মধ্যে খেজুর গাছ ছিল অন্যতম। খেজুরের রস ও খেজুরের মিঠা (রাভ মিঠা) গন্ধে গ্রামীণ জনপদ মৌ মৌ করত। শীত আসলেই গাছিরা ব্যস্ত হয়ে পড়ত খেজুর গাছ রসের উপযোগী করতে পরিষ্কারের কাজে ব্যস্ত হতেন। এতে গাছিরা এই সময় অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতেন।
বিভিন্ন পিঠা, পুলি ও পায়েসসহ নানা প্রকার খাবার তৈরির জন্য খেজুরের রস ছিল অন্যতম উপাদান। এ জন্য গাছিদের চাহিদার কথা বলে রাখতে হতো। ফলে যাদের খেজুর গাছ ছিল না তারাও রস খাওয়া থেকে বঞ্চিত হতেন না। তখন শীতে আনন্দময় পরিবেশ বিরাজ করত। বিশেষ করে পৌষ-মাঘ শীত মৌসুম এলে গাছিদের আনন্দের সীমা থাকত না। খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য মহাব্যস্ত হয়ে পড়তেন তারা।
গ্রামবাংলার ঐতিহ্য এই খেজুরগাছ আজ অস্তিত্ব সঙ্কটে। যে হারে খেজুরগাছ নিধন হচ্ছে সে তুলনায় রোপণ হয় না। শীত মৌসুমে সকালে খেজুরের তাজা রস যে কতটা তৃপ্তিকর তা বলে শেষ করা যাবে না। কৃষি বিভাগ ও কখনো খেজুরের গাছ আবাদ নিয়ে কথা বলতে বা, কৃষি মেলায় খেজুরের গাছ রোপণে উদ্বুদ্ধ করার পরামর্শ দিতে দেখা যায় না।
আপনার মতামত লিখুন :