• ঢাকা
  • শনিবার, ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২ মে, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ২ মে, ২০২৬

সোনাইমুড়ীর জোড়পোলে নতুন ব্রিজ: পরিবেশ ও পানি নিষ্কাশনে বড় হুমকি জোড়পোলে তৃতীয় ব্রিজ নির্মাণে চার খালের মুখে বাধা

মোহাম্মদ হানিফ স্টাফ রিপোর্টার :
সোনাইমুড়ী চৌরাস্তার ঐতিহাসিক ‘জোড়পোল’ এলাকায় বিদ্যমান দুটি ব্রিজের মাত্র ৫ ফুট দূরত্বে তৈরি করা হচ্ছে আরও একটি নতুন ব্রিজ। জেলা পরিষদের অনুমতি নিয়ে ব্যক্তি মালিকানায় নির্মিত এই ‘তৃতীয়’ ব্রিজের কারণে বাধাগ্রস্থ হতে চলেছে ৪ খালের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। গত এপ্রিলের ৫ তারিখ জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার ইমরান হোসেনের সুপারিশে জেলা পরিষদের নবনিযুক্ত প্রশাসক এই ব্রিজের অনুমোদন দেয়। এর আগে সোনাইমুড়ী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) দ্বীন আল জান্নাত অভিযান করে গত বছরে বন্ধ করে দিয়েছিলেন ব্রীজটির নির্মাণ কাজ। পরে গত ২৮ এপ্রিল দ্বীন আল জান্নাত বদলি হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পার হতে না দ্রুত গতিতে চলছে এই ব্রিজের নির্মাণ কাজ।

সরেজমিনে দেখা যায়, নোয়াখালী-কুমিল্লা মহাসড়কটির সোনাইমুড়ী চৌরাস্তা অংশে সোনাইমুড়ী-ছাতারপাইয়া এবং সোনাইমুড়ী-কুমিল্লা সড়কের ওপর পাশাপাশি দুটি ব্রিজ (জোড়পোল) আগে থেকেই বিদ্যমান। অথচ এই দুই ব্রিজের পাশেই বড় আকারে নতুন আরেকটি ব্রিজের কাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে চলাচলের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে এটি। গত বছরের ৯ ডিসেম্বর দ্বীন আল জান্নাত কর্তৃক খালেও ওপরে নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেওয়া হলেও সেসময় বাধ অপসারণ করেনি ব্রীজ নির্মাণকারীরা। সেসময় থেকে খালের মোহনায় মাটি ফেলে তৈরী অস্থায়ী বাঁধের কারনে পানি চলাচল বন্ধ রয়েছে। অস্থায়ী বাঁধের ওপরে জন্মেছে নানা ধরনের ঝোপঝাড়। দেখে বোঝার উপায় নেই এটা খালের অংশ।

তথ্য বলছে, চারটি প্রবাহমান খালের সংযোগ হয়েছে সোনাইমুড়ী চৌরাস্তার জোড়াপোল অংশে। যেখানে সোনাইমুড়ী বাজার থেকে আসা নৌকাঘাট খাল, সেনবাগ উপজেলা থেকে আসা ছাতারপাইয়া খাল, বজরা ইউনিয়ন থেকে রশিদপুর-বাটরা গ্রাম হয়ে বয়ে আসা খালের শাখা ও কুমিল্লা সীমান্ত হয়ে চাষীরহাট-রামপুর-কাঠালি ও বিজয়নগর গ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আসা খালটি যুক্ত হয়েছে সোনাইমুড়ী চৌরাস্তার জোড়াপোল অংশে। চৌরাস্তা অংশের দুটি (পোল) ব্রিজের একটির নিচ দিয়ে নৌকাঘাট ও ছাতারপাইয়া খাল যুক্ত হয়েছে। অপর ব্রিজের নিচ থেকে কুমিল্লা সীমান্ত হয়ে আসা ও বজরা থেকে প্রবাহিত খালের সংযোগ হয়েছে। এই চারটি খাল সোনাইমুড়ী ও সেনবাগ উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ও কৃষি কাজের পানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ইতি পূর্বে খালটি দখল থাকায় ২০২৪ সালে বন্যা পরবর্তী সময়ে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছিলো উপজেলা জুড়ে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কামাল হোসেন নামের এক প্রবাসী এই ব্রিজের কাজ করাচ্ছেন। তারা খালের পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার শর্তে জেলা পরিষদের অনুমতিপত্রের ভিত্তিতে এই নির্মাণ কাজ করছেন। তবে এই একই স্থানে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সোনাইমুড়ী উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছিলেন। এছাড়া গত ৯ ডিসেম্বর তৎকালীন এসিল্যান্ড দ্বীন আল জান্নাত নিজে এসে এই ব্রিজের নির্মাণ কাজ কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। জেলা পরিষদ থেকে এপ্রিলের ৫ তারিখে ব্রিজ নির্মাণের অনুমতি পেলেও দ্বীন আল জান্নাত বদলি হওয়ার পরেই নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান দুটি ব্রিজের পাশে এভাবে তৃতীয় আরেকটি ব্রিজ করলে পানির স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে চারটি খালের মুখ ময়লা ও পলি জমে দ্রুত ভরাট হয়ে যাবে।

প্রচলিত আইন অনুযায়ী, কোনো খালের জমির মালিকানা জেলা পরিষদের হলেও সেখানে অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে কেবল প্রশাসনিক অনুমতিই যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশ পানি আইন-২০১৩ এবং জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী, প্রাকৃতিক জলাশয়ের স্বাভাবিক গতিপথ সংকুচিত করা দণ্ডনীয় অপরাধ। কারিগরি প্রকৌশলীদের মতে, চারটি খালের সংযোগ স্থলের মতো সংবেদনশীল স্থানে পানির চাপ এবং প্রবাহের গতিবেগ নির্ণয় করার এখতিয়ার কেবল বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের। আইনত একজন সার্ভেয়ারের কাজ কেবল জমি পরিমাপ করা। ব্রিজের মতো কারিগরি স্থাপনার ফলে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি হবে কি না এমন নিশ্চয়তা বা সুপারিশ প্রদানের কোনো আইনগত ক্ষমতা বা কারিগরি এখতিয়ার তার নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ‘হাইড্রোলজিক্যাল ক্লিয়ারেন্স’ ব্যতীত এই নির্মাণ দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

এদিকে বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) বিকেলে নতুন এসিল্যান্ড জসিম উদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও জেলা পরিষদের অনুমতি পত্রের প্রেক্ষিতে কোনো তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেননি। তবে জেলা পরিষদের সেই চিঠিতে ব্রিজের কোনো নির্দিষ্ট মাপ বা নকশার উল্লেখ নেই।

নোয়াখালী জেলা পরিষদ কর্তৃক ইস্যুকৃত সেই অনুমতি পত্রের তথ্য বলছে, সোনাইমুড়ী উপজেলার নাওতলা মৌজার ০২,৩৮৪ নং খতিয়ানভুক্ত এবং সাবেক ৬২০ নং দাগের অংশে অবস্থিত নিজ জমিতে যাতায়াতের সুবিধার্থে একটি ব্রিজ নির্মাণের অনুমতি পেয়েছেন মিনু আক্তার। এই অনুমতিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক ৪৭৬ এবং ৬৬৩ নং দাগের সামনে নিজস্ব অর্থায়নে এই ব্রিজটি নির্মাণ করতে হবে। পত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ব্রিজ নির্মাণের ফলে খালের পানি প্রবাহ বা জনসাধারণের চলাচলে কোনো প্রকার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না। তবে বাস্তবে ব্রিজটি নির্মিত হলে নৌকাঘাট খাল, ছাতারপাইয়া খাল, বজরা হয়ে সোনাইমুড়ী ও কুমিল্লা সীমান্ত হয়ে সোনাইমুড়ীতে প্রবেশকরা খালের সংযোগ স্থলে পানি চলাচল বাধার সৃষ্টি হবে। এছাড়া পলি-আবর্জনার কারনে চারটি খালের মুখ সংকুচিত ও পানি প্রবাহে বাধার আশঙ্কা করছে সচেতন মহল।

এ বিষয়ে কথা হলে জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার ইমরান হোসেন দাবি করেন, ব্রিজ তৈরিতে কোনো সমস্যা হবে না। তবে ৪ খালের মিলনস্থলে কারিগরি জ্ঞানহীন একজন সার্ভেয়ারের এমন নিশ্চয়তা জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার ইমরান হোসেনের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে পরিবেশ ধ্বংস করে খাল ইজারা ও ব্রিজ নির্মাণের আবেদনে সুপারিশের অভিযোগ রয়েছে। ইতিপূর্বে সোনাইমুড়ীর দখল হওয়া নৌকাঘাট খাল সহ বিভিন্ন খাল সার্ভেয়ার ইমরান হোসেনের সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদন ও সুপারিশের ভিত্তিতেই ইজারা ও ব্রিজ নির্মাণের অনুমতি দিয়েছে জেলা পরিষদ। আর সেসকল অনেক খাল নানা ভাবে শ্রেণী পরিবর্তন করে রেখেছে দখলদারেরা।

এ বিষয়ে কথা বলতে কয়েকবার নোয়াখালী জেলা পরিষদের প্রশাসক মো: হারুনুর রশিদ আজাদের মুঠোফোনে কল দিলেও তা রিসিভ হয়নি।
পরবর্তীতে জেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ন রশিদের সাথে কথা হয় প্রতিবেদকের। তিনি জানান, এমন কোন ব্রিজের অনুমোদনের বিষয়ে কিছু জানেন না। চারটি খালের সংযোগ স্থলে ব্রিজ নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে তিনি জেলা পরিষদের প্রশাসকের সাথে কথা বলবেন।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর