
মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার :
সাংবাদিকতা কোনো সাধারণ পেশা নয়. এটি এক মহান দায়িত্ব, এক নৈতিক অঙ্গীকার এবং সমাজের প্রতি গভীর প্রতিশ্রুতির নাম। একজন সাংবাদিক কেবল সংবাদ পরিবেশন করেন না, তিনি সত্যকে দৃশ্যমান করেন, নীরব মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন এবং রাষ্ট্র ও জনগণের মাঝে একটি দৃঢ় সেতুবন্ধন নির্মাণ করেন। এ কারণেই সাংবাদিকদের বলা হয় সমাজের চোখ, কান ও বিবেক।
সমাজের দৃশ্যমান বাস্তবতার আড়ালে অসংখ্য অদেখা সত্য লুকিয়ে থাকে। দুর্গম চরাঞ্চলে বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া মানুষের আহাজারি, সরকারি হাসপাতালে অব্যবস্থাপনায় রোগীর মৃত্যু, উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র, কিংবা বিচারবঞ্চিত একটি পরিবারের নিঃশব্দ কান্না. এসব প্রথম জাতির সামনে তুলে ধরেন একজন সাংবাদিক।
ধরুন, গভীর রাতে কোনো এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। চারদিকে আতঙ্ক, চিৎকার, মানুষের ছুটোছুটি। সাধারণ মানুষ নিরাপদ দূরত্বে সরে দাঁড়ায়। কিন্তু সেই ভয়াবহ মুহূর্তে একজন সাংবাদিক আগুনের লেলিহান শিখার পাশে দাঁড়িয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন, ছবি ধারণ করেন, মানুষের আর্তনাদ শুনে তা জাতির সামনে পৌঁছে দেন। তার সেই প্রতিবেদন পরদিন প্রকাশিত হওয়ার পর প্রশাসন নড়ে বসে, ত্রাণ পৌঁছে যায়, সহায়তার হাত প্রসারিত হয়। আমরা কি কখনো ভেবে দেখি. এই মানুষটিও তো একজন বাবা, ভাই, সন্তান! তবু কেন তিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নেন? কারণ তিনি জনগণের সেবক, সত্যের সৈনিক।
একইভাবে, কোনো হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় একজন রোগীর মৃত্যু যদি চার দেয়ালের ভেতরেই চাপা পড়ে যেত, তাহলে হয়তো কখনোই জবাবদিহিতা তৈরি হতো না। কিন্তু একজন সাংবাদিক সেই ঘটনা তুলে ধরলে তদন্ত হয়, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এবং অনেক সময় ভবিষ্যতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ, একজন সাংবাদিকের কলম অনেক সময় নির্যাতিত, বঞ্চিত ও অসহায় মানুষের শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে।
সমাজের অসংখ্য অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরও সাংবাদিক। খাদ্যে ভেজাল, ওষুধে প্রতারণা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, জমি দখল, বাজার কারসাজি, মজুদদারি এসবের অন্তরালের বাস্তবতা সাংবাদিকতার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাড়া সাধারণ মানুষ জানতে পারত না।
যখন একজন সাংবাদিক নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধান করেন, তখন তিনি শুধু একটি সংবাদ লিখছেন না; তিনি সাধারণ মানুষের জীবনযুদ্ধকে সহজ করতে কাজ করছেন। যখন তিনি কোনো সড়কের বেহাল অবস্থার প্রতিবেদন প্রকাশ করেন এবং পরে সেই রাস্তা সংস্কার হয়, তখন তিনি সরাসরি জনসেবায় অবদান রাখছেন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ সমাজের একাংশ সাংবাদিকতাকে সন্দেহের চোখে দেখে। সত্য প্রকাশের কারণে অনেকেই সাংবাদিকদের চক্ষুশূল মনে করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গালিগালাজ, কটূক্তি, অপমান ও হুমকি যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ আমাদের আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন। যে সাংবাদিক দুর্যোগের দিনে মাঠে থাকেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লিখে হুমকি পান, অসহায় মানুষের বিচার দাবিকে জাতির সামনে তুলে ধরেন. তাকে কেন অবজ্ঞা করা হবে? কেন তার প্রাপ্য হবে গালি? একটি বিচ্ছিন্ন ভুল বা কিছু অসাধু ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের দায় পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কখনোই ন্যায়সঙ্গত নয়।
হ্যাঁ, সাংবাদিকতার ভেতরেও কিছু দুর্বলতা রয়েছে। কিছু ব্যক্তি ব্যক্তিস্বার্থে এই মহান পেশাকে ব্যবহার করেন। কিন্তু কোনো পেশাই ত্রুটিমুক্ত নয়। চিকিৎসক, আইনজীবী, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ সব পেশাতেই ব্যতিক্রম আছে। তাই কয়েকজনের জন্য পুরো পেশাকে দোষারোপ করা সমাজের পরিপক্বতার পরিচয় হতে পারে না। বরং আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি জাতির উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন সেখানে তথ্যের অবাধ প্রবাহ, জবাবদিহিতা এবং সচেতন নাগরিক সমাজ থাকবে। আর এই তিনটি স্তম্ভের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সাংবাদিকতা।
একটি গ্রামে যদি স্কুলে শিক্ষক সংকটের খবর প্রকাশের পর নতুন শিক্ষক নিয়োগ হয়.সেখানে সাংবাদিক জনগণের সেবক। কোনো সড়ক দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে যদি রাস্তা সংস্কার হয় সেখানে সাংবাদিক জনগণের সেবক। কোনো অসহায় পরিবার সংবাদ প্রকাশের পর চিকিৎসা সহায়তা পায়। সেখানেও সাংবাদিক জনগণের সেবক। সাংবাদিকরা সমাজের ক্ষত দেখান, যেন তা সারানো যায়। রাষ্ট্রের ভুল তুলে ধরেন, যেন তা সংশোধিত হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লেখেন, যেন ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়। আবার উন্নয়নের খবরও তুলে ধরেন, যেন ভালো উদ্যোগগুলো দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
তাই সাংবাদিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সমাজের দায়িত্ব। সমালোচনা অবশ্যই থাকবে, তবে তা হতে হবে গঠনমূলক। গালিগালাজ, হুমকি কিংবা অবমাননা কখনোই কোনো সমস্যার সমাধান নয়।
আমাদের মনে রাখা উচিত যে কলম সত্য লিখে, সে কলম শুধু সংবাদ লেখে না. সে সমাজকে জাগিয়ে তোলে, জাতির বিবেককে নাড়া দেয় এবং পরিবর্তনের পথ তৈরি করে। সুতরাং সময়ের দাবি হলো সাংবাদিকদের সম্মান করা, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সত্য প্রকাশের স্বাধীনতাকে আরও শক্তিশালী করা। কারণ জনগণের সেবায় নিয়োজিত এই পেশাটিই একটি সচেতন, মানবিক ও উন্নত সমাজ গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।
সত্যের পথে যারা নির্ভীক, তাদের প্রতি থাকুক কৃতজ্ঞতা; গালি নয়, সম্মান হোক তাদের প্রাপ্য।
আপনার মতামত লিখুন :