• ঢাকা
  • শুক্রবার, ৩রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৯শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২ জুলাই, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ২ জুলাই, ২০২৬

ফুটবলের নিষ্ঠুর আততায়ীর শিকার সেনেগাল

ম্যাচটা শেষ হতে তখনো অল্প কিছু সময় বাকি। কিন্তু সর্বনাশের ষোলো কলা এরই মধ্যে পূর্ণ হয়ে গেছে। কয়েক সেকেন্ড পর কী ঘটতে যাচ্ছে কারও বুঝতে বাকি নেই। সেনেগালের দর্শকদের হতবিহ্বল অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছিল, বিশ্বকাপের রঙিন মঞ্চে আরেকটি স্বপ্ন ভঙ্গ হলো বলে!

একটু পর হয়েছেও তাই। ৮৫ মিনিট পর্যন্ত ২–০ গোলে এগিয়ে থাকা সেনেগাল অতিরিক্ত সময় শেষে ৩–২ গোলে হেরে গেল। শেষ বাঁশি বাজার পর স্টেডিয়ামের আনন্দিত ও বেদনাহত মানুষেরা মুহূর্তেই দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল।

একটু আগে বিদায়ের ক্ষণ গুনতে থাকা বেলজিয়াম যেখানে উৎসবের তীব্র উল্লাসে ফেটে পড়েছে, সেখানে সেনেগাল শিবিরে তখন কান্নার রোল। হতাশায় ভেঙে পড়া এই মানুষগুলোর মুখ পৃথিবীর যেকোনো মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যেতে বাধ্য।

বিশেষ করে লামিন কামারার কান্না যেন পরাজয়ের বেদনায় আরও গভীর এক ক্ষত এঁকে দিচ্ছিল। শেষ মুহূর্তের পেনাল্টিটা তাঁর ফাউলের কারণেই পেয়েছিল বেলজিয়াম। এই দায়টাই ম্যাচ শেষ হতেই যেন চেপে বসেছিল তাঁর কাঁধে। কান্না তাই থামছিল না, কবে যে থামবে কে জানে!

নিজেদের আবেগ সামলে সতীর্থরা সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছিলেন কামারাকে। এগিয়ে আসলেন দলের স্টাফরাও। নাহ, কেউ পারছেন না কামারাকে থামাতে। একটু পর এগিয়ে এলেন এই ম্যাচে বেলজিয়ামের জয়ের নায়ক ইউরি টিলেমান্সও। মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে তিনিও চেষ্টা করলেন কামারাকে শান্ত করতে। নাহ, কিছুতেই যেন কিছু হওয়ার নয়। কে জানে, এই কান্নার রেশ ভুলতে কামারার হয়তো গোটা জীবনটাই লেগে যায় কি না!

কামারার কান্না দেখতে দেখতে একটা কথাই বারবার মনে হচ্ছিল, এমনও হয় নাকি! এভাবেও কি হারতে হয়! নিয়তি কেন যে এত নির্মম! এই হার শুধু কামারা নন, সাদিও মানে–ইসমাইলা সারদেরও অনেক দিন তাড়া করবে। কারণ হবে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠা অনেক রাতের। এই তো কদিন আগে জেতার পরও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল সেনেগালের আফকন শিরোপা। আর এবার বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে এমন বিদায়। ভাগ্যের সঙ্গে চাইলে অভিমান করতেই পারেন সেনেগালের খেলোয়াড়েরা।

ফুটবল অবশ্য এ রকমই। পৃথিবীর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর খেলাটি মুহূর্তের মধ্যে হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর আততায়ী। হাসতে হাসতে ছুরি বসিয়ে দিতে পারে বুকের বাঁ পাশে। তেমনই আততায়ীর হাতে আহত হওয়ার ক্ষত নিয়ে আজ বাড়ি ফিরবেন সেনেগালের খেলোয়াড় ও ভক্ত–সমর্থকেরা। হয়তো মনে মনে ভাববেন, এমন নিষ্ঠুর খেলাটি না খেললেই তো হয়!

এই ম্যাচটিকেই অবশ্য দেখা হচ্ছিল সম্ভাব্য নীরস ম্যাচ হিসেবে। সেনেগাল ২–০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর অনেকে হয়তো টেলিভিশন বন্ধ করে ঘুমাতেও চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু কিছু হওয়ার আশায় যেসব আশাবাদী মানুষ বসেছিলেন, তাঁরা পেয়ে গেছেন ‘উপহার’। বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা এক রোমাঞ্চের সাক্ষী হয়েছেন তাঁরা।

এটি এমন ম্যাচ, যেখানে একটি দল ৮৫ মিনিট পর্যন্ত ২–০ গোলে এগিয়ে থাকার পরও ৯০ মিনিট সেই লিড ধরে রাখতে পারল না। আবার প্রতিপক্ষ দলকে ১১৯ মিনিট আটকে রাখার পরও ম্যাচটিকে শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে নিতে পারল না। এই না পারা ব্যাখ্যাতীত! কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া এই কয়েক মিনিটের কোনো উত্তর হয় না। সিয়াটলে আজ ভোরে ম্যাচ শেষে সেনেগালের খেলোয়াড়, স্টাফ থেকে সমর্থক- সবার চোখমুখও যেন সেই ব্যাখ্যাতীত মুহূর্তগুলোর উত্তর খুঁজছিল।

সেনেগালের এই হারের পেছনে অনেক কারণ বের করা যায়। রেফারির বিতর্কিত পেনাল্টির সিদ্ধান্ত, বেলজিয়ামের হার না–মানা মানসিকতা কিংবা নিজেদের রক্ষণে গন্ডগোল পাকানো। তবে কারণ যা–ই হোক, সত্যি কথা হচ্ছে, কামারার কান্না সিয়াটলের বাতাসকে আরও অনেক দিন ভারী করে রাখবে। মারকানা কিংবা বেলো হরিজেন্তেতে কান পাতলে যেমন ব্রাজিলিয়ানদের কান্না শোনা যায়, তেমনি অনেক দিন পর সিয়াটল স্টেডিয়ামের ঘাসে কান পাতলে শোনা যাবে লামিনে কামারার ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ।

আরও পড়ুন