
উপজেলা সংবাদদাতা, হাতিয়া : হাড়ভাঙা খাটুনি আর রক্ত পানি করা উপার্জনে একটু একটু করে টাকা জমিয়েছিলেন এক রেমিট্যান্স যোদ্ধা। স্বপ্ন ছিল নিজ দেশে মাথা গোঁজার একটা নিরাপদ আশ্রয় হবে, সুরক্ষিত হবে পরিবারের ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন ১২ বছরের এক দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়েছে।
হাতিয়ায় জমি কিনে চরম প্রতারণা ও বিপাকে পড়েছেন ওলি উল্লাহ নামের এক প্রবাসী। ২১ লাখ টাকার জমি কিনে এক যুগ (১২ বছর) পার হয়ে গেলেও মিলছে না মালিকানা, হচ্ছে না রেজিস্ট্রি। নিজের কষ্টার্জিত টাকা দিয়েও এখন জমির অধিকার পেতে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন এই ভুক্তভোগী ক্রেতা। আর এই প্রতারণার মূল অভিযোগ উঠেছে খোদ একজন সরকারি ভূমি কর্মকর্তার (তহশিলদার) বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীর পরিবার থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালে হাতিয়া উপজেলার সোনাদিয়া ইউনিয়নের চরচেঙ্গা বুতিগো দোকানের পূর্ব পাশে অবস্থিত ‘দেড় কানি’ জমি বিক্রির একটি চুক্তি হয়। জমির মালিক স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল সহিদের ছেলে আবদুল হান্নান। তিনি পেশায় একজন তহশিলদার (ভূমি কর্মকর্তা) হিসেবে কর্মরত।
২১ লক্ষ টাকা মোট মূল্য নির্ধারণ করে জমিটি কেনার জন্য প্রবাসীর সাথে চুক্তি চূড়ান্ত হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ভুক্তভোগী ওলি উল্লাহ নগদ ১২ লক্ষ টাকা আবদুল হান্নানের হাতে তুলে দেন। বাকি টাকা জমি রেজিস্ট্রি দেওয়ার সময় পরিশোধ করার কথা লিখিত ও মৌখিকভাবে সম্মত হয় উভয় পক্ষ।
আইন ও ভূমির রক্ষক হয়েও অভিযুক্ত ভূমি কর্মকর্তা আবদুল হান্নান নিজেই মেতে উঠেছেন প্রতারণায়—এমনটাই অভিযোগ ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের। দেখতে দেখতে কেটে গেছে দীর্ঘ ১২টি বছর। ক্রেতাকে জমির রেজিস্ট্রি বুঝিয়ে দেওয়া তো দূরের কথা, উল্টো নতুন প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছেন অভিযুক্ত তহশিলদার।
প্রবাসীর কাছ থেকে টাকা নিয়েও জমিটি অন্য এক চাষির কাছে মোটা অঙ্কের বিনিময়ে বন্ধক রেখেছেন তিনি। ফলে জমির দখল বা মালিকানা—কোনোটিই বুঝে পাননি প্রবাসী ওলি উল্লাহ।
ভুক্তভোগী ওলি উল্ল্যাহ বলেন আমি ২০১৫ সালে আমার সারা জীবনের কষ্টার্জিত ১২ লাখ টাকা হান্নানের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম নিজের একটা ঠিকানা হবে, পরিবার একটু শান্তিতে থাকবে। কিন্তু এতগুলো বছর পার হয়ে গেলেও হান্নান আমাকে জমি বুঝিয়ে দিচ্ছেন না, রেজিস্ট্রিও দিচ্ছেন না। আমি কোনো ঝামেলা চাই না, শুধু আমার ন্যায্য জমিটা ও নিজের অধিকার ফেরত চাই।”
টাকা লেনদেনের প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী আহম্মদ উল্লাহ ও স্থানীয় প্রতিবেশীরা জানান, তাদের সামনেই এই বিশাল অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়েছিল। দীর্ঘ ১২ বছরেও ক্রেতাকে জমি বুঝিয়ে না দিয়ে উল্টো অন্যকে চাষ করতে দেওয়া পুরোপুরি অন্যায়, অমানবিক এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। স্থানীয় সমাজসেবক সাহাব উদ্দিনও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত সুষ্ঠু সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত আবদুল হান্নান নিজের দোষ কিছুটা স্বীকার করে নেন। তিনি দাবি করেন, জমির কাগজপত্রে কিছু আইনি জটিলতা থাকায় তিনি সময়মতো রেজিস্ট্রি দিতে পারেননি। তবে জমি রেজিস্ট্রি দিতে না পারলে ক্রেতার টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
তবে এক যুগ পর এসে টাকা ফেরতের এই অজুহাত ও কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী পরিবার। তাদের মতে, ১২ বছর আগের ১২ লাখ টাকা আর বর্তমান বাজারমূল্যের ব্যবধান আকাশ-পাতাল। এখন ওই টাকা দিয়ে সমপরিমাণ জমি কেনা অসম্ভব।
নিজের জমিতে পা রাখতে না পেরে বুকভরা হতাশা আর চরম অনিশ্চয়তা নিয়ে দিন কাটছে প্রবাসী ওলি উল্লাহর পরিবারের। একজন সরকারি ভূমি কর্মকর্তার এমন প্রতারণামূলক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে ক্ষুব্ধ গোটা এলাকাবাসী।
এই অসহায় প্রবাসী পরিবারের কান্না থামাতে, প্রতারণার শিকার ওলি উল্লাহকে তার ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে এবং অভিযুক্ত তহশিলদারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, জেলা প্রশাসক ও ঊর্ধ্বতন ভূমি প্রশাসনের জরুরি ও আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও সচেতন সমাজ।
আপনার মতামত লিখুন :