প্রকাশিত: ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ৩১ জানুয়ারি, ২০২৬

গুজব-সহিংসতায় নির্বাচনী প্রশ্নে আরও তেজ- রিন্টু আনোয়ার

নির্ধারিত সিডিউল অনুযায়ী নির্বাচনের ট্রেন এখন স্টেশনের কাছাকাছি। অথচ ঘুরছে নানা সংশয়, সাথে প্রশ্নের বোমা। তা অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও বাস্তব। এর পেছনে বহু কারণ আছে। রাজনীতিতে তর্ক হবে, বিতর্কও হবে—নির্বাচন এলে তা আরও তীব্র হয়। মাঠে তাপ-উত্তাপ বাড়ে, উত্তেজনাও আসে। কিন্তু তাই বলে খুন-খারাবি?

তফসিল ঘোষণার পরদিনই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী, তরুণ ওসমান হাদী গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারালেন। তার জানাজাকে ঘিরে সহমর্মিতার বাতাবরণে ভালো কিছুর আশাবাদ জাগলেও সেটি ফিকে হয়ে যায় একের পর এক ঘটনার মধ্যে। সর্বশেষ শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে সংঘর্ষে আহত জামায়াত নেতা মাওলানা রেজাউল করিমও প্রাণ হারিয়েছেন। এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে শীর্ষ পর্যায়ের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, আর বিভিন্ন জেলায় সংঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা নির্বাচনের আগেই মাঠকে ক্রমে উত্তপ্ত করে তুলেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন থাকবে, তা নিয়ে আগে থেকেই যে উদ্বেগ ছিল, তা এখনো কাটেনি—বরং প্রতিনিয়ত বাড়ছে। রাজধানীসহ মফস্বল জেলাগুলোতেও ভর উত্তেজনা।

ঢাকা-৮ আসনে যেন এক প্রকার যুদ্ধাবস্থা। সেখানে বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাসকে শুরু থেকেই কটূক্তির মাধ্যমে আক্রমণ করছেন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি আব্বাসকে ‘গ্যাংস্টার’, ‘চাঁদাবাজ’, ‘ক্রিমিনাল’ ও ‘গডফাদার’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এমনকি বিএনপির আরও দুই নেতাকেও সন্ত্রাসী বলেছেন।

শেরপুরে ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসাকে কেন্দ্র করে জামায়াত-বিএনপির সংঘর্ষে একজনের মৃত্যু, শরীয়তপুরের নড়িয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে ঘিরে সংঘর্ষ—এসব খবর উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। নাটোর, সিরাজগঞ্জ, নড়াইল, ভোলা, লালমনিরহাট, চুয়াডাঙ্গা ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জায়গায় বিএনপি-জামায়াতের ভেতরেই সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে। এতে সামনে আরও বড় সহিংসতার আশঙ্কা ঘনিয়ে আসছে।

নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে ঢাকা-৮ আসনের জামায়াত–এনসিপি জোট প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম হামলার ঘটনাও আলোচনায়। তিনি এর জন্য মির্জা আব্বাসকে দায়ী করেছেন, অন্যদিকে বিএনপি অভিযোগ তুলেছে নাসীরুদ্দীনের ‘উসকানিমূলক’ বক্তব্যের বিরুদ্ধে। সামাজিক মাধ্যমে চলছে তীব্র বাকযুদ্ধ। ‘নতুন ধারার’ রাজনীতির কথা বলা হলেও বাস্তবে পুরনো ধারারই পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে।

নানা কারণে এবারের নির্বাচন আকাঙ্ক্ষার দিক থেকে ভিন্ন মাত্রার। বহুল প্রতীক্ষা ও অনিশ্চয়তার পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়েছে। প্রচারণায় প্রতিশ্রুতির বন্যা স্বাভাবিক হলেও সহিংসতা তার ছায়া ফেলছে।

আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে গুজবের দাপট। মিথ্যাকে সত্য, সত্যকে মিথ্যা বানিয়ে দেওয়া—এই ‘ডিপফেক’ ও অপতথ্যের দুনিয়া এখন স্বাভাবিক জীবনকেও বিষাক্ত করে তুলছে। মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে, সংঘাত বাড়ছে, উদ্দেশ্য সিদ্ধ হচ্ছে গোষ্ঠী বিশেষের। ভোটের দিন পর্যন্ত এই প্রবণতা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে—তা নিয়ে শঙ্কা গভীর।

ভুয়া তথ্য প্রতিরোধে সরকার জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা চেয়েছে। জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি (NCSA) বিশেষ সেল গঠন করেছে; কাজ করছে সিআইডি, বিটিআরসি, পিআইবি, বাসস ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো। কিন্তু চেষ্টা সত্ত্বেও গুজব ঠেকানো যাচ্ছে না।

ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা রিউমার স্ক্যানারের তথ্যমতে, ডিসেম্বর মাসেই ৪৪৬টি রাজনৈতিক ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। নির্বাচনের আগের সময়টায় অনলাইন হয়ে উঠছে মিথ্যা খবর ও ডিপফেক ভিডিওতে সয়লাব।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এখন এই বিভ্রান্তি ছড়ানোর শক্তিশালী হাতিয়ার। একসময় এটি ছিল ভবিষ্যতের কল্পনা; এখন তা হাতের মোবাইলেই। উন্নত অ্যালগরিদমের মাধ্যমে তথ্য বিশ্লেষণ ও কনটেন্ট তৈরি করার সক্ষমতা একে যেমন শক্তিশালী করেছে, তেমনি অপব্যবহারও ভয়াবহ করে তুলেছে। AI দিয়ে মিথ্যা ভিডিও বা ছবি বানিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানো এখন সহজ।

এই কারণেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার ঠেকাতে স্পষ্ট নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক সমন্বয় জরুরি। না হলে এর ছোবল থেকে কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রক্ষা পাবে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়ন্ত্রণ হারালে এ প্রযুক্তিই মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, ভারত, পোল্যান্ডসহ বহু দেশের নির্বাচনে এর অপব্যবহার দেখা গেছে। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনেও কিছু নিদর্শন ছিল। এবারের নির্বাচনে সহজলভ্যতার কারণে ঝুঁকি আরও বেশি।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতের অঙ্গীকার করেছে। প্রশ্ন হলো—তারা কি সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারবে? দেশজুড়ে এখন সেই প্রশ্নই ঘুরছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বছরের পর বছর ধরে চলা প্রতিহিংসা ও প্রতিপক্ষ নির্মূলের সংস্কৃতি থেকে আমরা কি সত্যিই বেরোতে পারব? না কি সেটিই আমাদের অঘোষিত নিয়তি হয়ে যাবে?

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর