
নোয়াখালীর কথা ডেস্ক : পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র দুই দিন বাকি। মুসলিমদের অন্যতম বড় এই ধর্মীয় উৎসব পালনে পরিবার-পরিজন নিয়ে রাজধানী ছাড়ছেন লাখো মানুষ। সেই সুযোগে রাজধানীর বিভিন্ন বাস কাউন্টারে চলছে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার মহোৎসব।
মঙ্গলবার (২৬ মে) সকাল থেকে কমলাপুর, আরামবাগ, সায়েদাবাদ, টিটিপাড়া ও মানিকনগর এলাকার বাস কাউন্টারগুলোতে সরেজিমন ঘুরে এমনই চিত্র দেখা গেছে।
এসময় কাউন্টারগুলোতে ছিল ঘরমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড়। এই বাড়তি চাপকে কেন্দ্র করে এবারের ঈদেও নেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া। যাত্রীদের পকেট কে কতটা বেশি ফাঁকা করতে পারে, বাস কাউন্টারগুলোতে যেন চলছে তারই নির্মম প্রতিযোগিতা।

নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ঢাকা-লক্ষ্মীপুর, ঢাকা-নোয়াখালী ও চট্টগ্রামমুখী বিভিন্ন পরিবহনের বিরুদ্ধে।
যাত্রীরা বলছেন, প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদকে কেন্দ্র করে বাস মালিক ও কাউন্টার কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে।
মঙ্গলবার দুপুরে আরামবাগ, কমলাপুর ও সায়েদাবাদ ঘুরে দেখা যায়, কাউন্টারগুলোর সামনে দীর্ঘ লাইন। কেউ টিকিট সংগ্রহ করছেন, কেউ আবার বাস ছাড়ার অপেক্ষায় বসে আছেন ব্যাগপত্র নিয়ে। শিশু, নারী ও বয়স্ক যাত্রীদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। সেই ভিড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই বাড়ছে টিকিটের দাম।

যাত্রীদের অভিযোগ, কয়েক দিন আগেও যে টিকিট ৪৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেই একই টিকিট এখন ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো পরিবহন আবার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নিচ্ছে।
সায়েদাবাদের হুজুরবাড়ি এলাকার ইকোনো পরিবহনের কাউন্টারে কথা হয় লক্ষ্মীপুরগামী যাত্রী কামালের সঙ্গে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ঈদ এলেই বাড়তি ভাড়ার বোঝা মাথায় নিয়ে বাড়ি যেতে হয়। কয়েক দিন আগেও যে টিকিট ৫৫০ টাকা ছিল, আজ সেটি ৮০০ টাকায় কিনতে হয়েছে। বাধ্য হয়েই নিতে হচ্ছে। কারণ বাড়ি তো যেতেই হবে।
একই অভিযোগ করেন আরও কয়েকজন যাত্রী। তারা বলেন, পরিবার নিয়ে যাতায়াত করতে গেলে অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু প্রতিবাদ করেও কোনো লাভ হচ্ছে না।

আরামবাগে লাল সবুজ পরিবহনের কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নোয়াখালীগামী কয়েকজন যাত্রী জানান, শুক্রবার ও ঈদের আগের দিন ভিড় বাড়বে ভেবে তারা আগেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু মঙ্গলবারই ভাড়া অনেক বেশি বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
আবু হানিফ নামে এক যাত্রী বলেন, ভেবেছিলাম আগে গেলে হয়তো ভাড়া কিছুটা কম হবে। কিন্তু এখন দেখছি পরিস্থিতি আরও খারাপ। কাউন্টারে গেলে বলে সিট কম, তাই ভাড়া বেশি। সরকারি তালিকা অনুযায়ী, নোয়াখালী চৌমুহনী চৌরাস্তা ভাড়া ৪৫০টাকা, লাল-সবুজ ননএসি নিচ্ছে ৭৫০টাকা।
ঢাকা থেকে নোয়াখালীর উদ্দেশে রওনা হয়েছেন সাইফুল ইসলাম। তিনি জানান, ঢাকা থেকে নোয়াখালীর ভাড়া নন এসি ৪০০ টাকা, কাউন্টারে নিচ্ছে ৮০০ টাকা। এটা রীতিমতো ডাকাতি।

একই রুটের যাত্রী জসিম বলেন, ঈদের সময় বাড়ি যাওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পরিবহনগুলো যাত্রীদের জিম্মি করছে। পরিবার নিয়ে বাড়ি যাওয়ায় অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই বেশি ভাড়া দিয়ে টিকিট কাটতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কাউন্টারভেদে একই গন্তব্যের টিকিটের দামে পার্থক্য রয়েছে। কোথাও ৭০০ টাকা, কোথাও ৮৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। অনেক যাত্রী অভিযোগ করেন, কাউন্টারগুলোতে কোনো নির্ধারিত ভাড়ার তালিকাও টাঙানো নেই। ফলে যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো টাকা আদায় করা হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইকোনো পরিবহনের এক কাউন্টার ম্যানেজার বলেন, এখন যে বাসগুলো ঢাকা থেকে ছেড়ে যাচ্ছে, সেগুলো ঢাকায় ফেরার পথে অনেক সময় খালি আসে। সে কারণে তেলের খরচ তুলতে ভাড়া কিছুটা বেশি নেওয়া হচ্ছে। কিছু যাত্রী আবার খুশি হয়ে বকশিসও দেন।

তবে যাত্রীরা এই যুক্তিকে অযৌক্তিক বলে দাবি করেছেন। তারা বলছেন, তেলের খরচ বা খালি বাস ফেরার বিষয়টি যাত্রীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া স্পষ্ট অনিয়ম।
লাল সবুজ পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজারও অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করেননি। তিনি বলেন, আমরা তো কম রেখেছি। অন্যরা আরও বেশি নিচ্ছে। বছরের অন্যান্য সময় নির্ধারিত তালিকার চেয়েও কম ভাড়ায় যাত্রী নেওয়া হয়। ঈদের সময় সামান্য বেশি নেওয়া হয়।
মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ও আশপাশের কাউন্টারগুলো ঘুরে বিআরটিএ বা বাস মালিক সমিতির কাউকে তদারকিতে দেখা যায়নি।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের সময় যাত্রীদের চাপ বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন খাতে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়। অনেক সময় ফিরতি পথে যাত্রী কম থাকায় পরিবহন মালিকেরা বাড়তি ভাড়া নিয়ে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।

এদিকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম দাবি করেন, সড়কে কোনো ধরনের দুর্বৃত্তায়ন বরদাস্ত করা হবে না। প্রতিটি কাউন্টারে নির্ধারিত ভাড়ার স্টিকার লাগানো হয়েছে। বাসেও ভাড়ার তালিকা সংযুক্ত করা হয়েছে। যাত্রীরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় নির্ধারিত সময়ে ভালোভাবে বাড়ি যেতে পারছেন এবং মোবাইল কোর্টও কাজ করছে।
তিনি বলেন, যাত্রীরা সরাসরি পরিবহনের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ জানালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনেক যাত্রী অগ্রিম টিকিট না কাটার কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীদের অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে চালক বা সুপারভাইজার অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, আড়ালে-আবডালে দুর্বৃত্ত আছে, সেটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে তাদের কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। এরপরও কেউ যদি ভাড়া বেশি নিয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেওয়া হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে বাস মালিক সমিতির বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করার অভিযোগ এনেছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
তিনি বলেন, তাদের কারণে বাসে বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও সড়কে মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে সাধারণ মানুষ ঝুঁকি নিয়ে ট্রেন, মালবোঝাই গাড়ির ছাদে বাড়ি ফিরতে গিয়ে লাশ হচ্ছে। এমতাবস্থায় সাধারণ মানুষের ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য বন্ধ ও দুর্ঘটনারোধে সরকারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

মোজাম্মেল হক বলেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি তাদের বিভিন্ন জেলা শাখা ও ইউনিট শাখার বিভিন্ন বাসে আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করার প্রতিশ্রুতি করেছিলেন। কিন্তু সেটা তারা ইতোমধ্যে ভঙ্গ করেছেন। অতিরিক্ত ভাড়া বহনের সামর্থ্য না থাকায় চট্টগ্রাম থেকে স্বল্প ভাড়ায় রডবোঝাই ট্রাকে করে শ্রমজীবী মানুষেরা সুদূর নওগাঁ যাওয়ার পথে টাঙ্গাইলের যমুনা সেতুর পূর্ব প্রান্তে ট্রাক উল্টে ১৭ জন নিহত ও ১০ জন গুরুত্বর আহত হন। নরসিংদীর ঘোড়াশালে ট্রেনের ছাদে বজ্রপাতে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতি বছর ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কারণে সামর্থ্যহীন খেটে খাওয়া, কর্মজীবী, শ্রমজীবী, দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিকসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের লাখ লাখ মানুষ ট্রেনের ছাদে, বাসের ছাদে, খোলা ট্রাকে, পণ্যবোঝাই ট্রাকে কম ভাড়ায় যাতায়াতে বাধ্য হচ্ছে। যাদের ঘাম শ্রমে আমাদের অর্থনীতির মজবুত হয়, তাদের বছরে দুটি ঈদে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিতে রাষ্ট্র বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।
তাই অনতিবিলম্বে ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য বন্ধে বাস মালিক সমিতির প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা, সরকারি নির্দেশনা মানতে বাধ্য করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
আপনার মতামত লিখুন :