
মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার : সোনাইমুড়ীতে নিখোঁজের দুই বছর পর পুকুরের মাটি খুঁড়ে উদ্ধার হলো মা ও শিশুপুত্রের কঙ্কাল। সম্পত্তির লোভে পরিকল্পিতভাবে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে শ্বাসরোধে হত্যা, এরপর গভীর রাতে লাশ গুম এমন নির্মম ও শিউরে ওঠার মতো ঘটনায় স্তব্ধ পুরো এলাকা। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে চাঞ্চল্যকর এই জোড়া খুনের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
রোববার (২৪ মে) দুপুরে উপজেলার জয়াগ গ্রামের আবু আমিনের বাড়ির পুকুরপাড়ে খননকাজ চালিয়ে উদ্ধার করা হয় কমলা বেগম ও তার শিশু ছেলে মো. নোমানের দেহাবশেষ। এ ঘটনায় নিহত কমলা বেগমের দুই সৎ ছেলে সাইফুল ইসলাম ওরফে রাজন ওরফে রাজু, জিয়াউর রহমান ওরফে সাগর এবং তাদের সহযোগী আশিকুর রহমান টিপুকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি।
সিআইডির দাবি, প্রায় এক কোটি টাকার সম্পত্তি দখলকে কেন্দ্র করেই পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয় এই হত্যাকাণ্ড। দীর্ঘদিন নিখোঁজের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই এলাকায় নেমে এসেছে শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্কের ছায়া।
স্থানীয়রা জানান, কমলা বেগম ছিলেন অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের নারী। স্বামী আবুল কালাম আজাদের মৃত্যুর পরও তিনি সৎ সন্তানদের সঙ্গে একই বাড়িতে বসবাস করতেন। তার একমাত্র ছেলে নোমান ছিল পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য। প্রতিবেশীদের ভাষ্য, মা-ছেলেকে কখনো কারও সঙ্গে ঝগড়া বা বিরোধে জড়াতে দেখা যায়নি।
জয়াগ গ্রামের বাসিন্দা আবদুল মালেক বলেন, আমরা ভাবতাম তারা হয়তো কোথাও চলে গেছে। কিন্তু এভাবে মেরে পুকুরপাড়ে পুঁতে রাখা হয়েছে এটা জানার পর পুরো গ্রাম হতবাক।আরেক প্রতিবেশী নুরজাহান বেগম বলেন, নোমান খুব শান্ত একটা শিশু ছিল। ওর হাসিমুখ এখনো চোখে ভাসে। একটা ছোট বাচ্চাকেও এভাবে মেরে ফেলতে পারে এটা ভাবতেই গা শিউরে ওঠে।তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগে আবুল কালাম আজাদ তার দ্বিতীয় স্ত্রী কমলা বেগম ও তাদের ছেলে নোমানের নামে বসতভিটাসহ প্রায় ৩০ শতাংশ জমি লিখে দেন। বর্তমান বাজারমূল্যে যার মূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। এই সম্পত্তি নিয়েই প্রথম সংসারের সন্তানদের সঙ্গে বিরোধ শুরু হয়।
সিআইডি কর্মকর্তারা জানান, বিদেশ থেকে দেশে ফেরার পর জিয়াউর রহমান ওরফে সাগর সম্পত্তি নিজেদের নামে ফিরিয়ে নিতে চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। জমি বিক্রির টাকার ভাগ নিয়েও পরিবারে দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে। তদন্তে আরও উঠে আসে, ঘটনার কয়েকদিন আগে কমলা বেগম ও তার ছেলেকে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।
সিআইডির তদন্তে বেরিয়ে আসে হত্যার ভয়ঙ্কর পরিকল্পনার চিত্র। ঘটনার প্রায় দুই সপ্তাহ আগেই পুকুরপাড়ে গোপনে গর্ত খুঁড়ে রাখা হয়। এরপর ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাতে কমলা বেগম ও তার ছেলে নোমানের খাবারের পানির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেওয়া হয়। গভীর রাতে তারা অচেতন হয়ে পড়লে গলায় গামছা পেঁচিয়ে, হাত দিয়ে গলা চেপে এবং বালিশ চাপা দিয়ে তাদের হত্যা করা হয়।
হত্যার পর আলামত নষ্ট করতে তাদের কাপড় পুড়িয়ে ফেলা হয়। পরে রাতের আঁধারে পূর্বপ্রস্তুত গর্তে মা ও শিশুপুত্রের লাশ পুঁতে রাখা হয়।
ঘটনার পর ১০ মার্চ সোনাইমুড়ী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, কমলা বেগম নিখোঁজ রয়েছেন। তবে নিহতের ছোট বোন রহিমা বেগম শুরু থেকেই বিষয়টিকে রহস্যজনক মনে করেন। পরে তিনি আদালতে পিটিশন মামলা দায়ের করলে তদন্ত শুরু হয়।
প্রথমে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং পরে মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হয়। দীর্ঘ অনুসন্ধানে একটি পুরোনো মোবাইল ফোন থেকেই তদন্তে বড় অগ্রগতি আসে। সিআইডি জানতে পারে, কমলা বেগমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ঢাকার সবুজবাগ এলাকার একটি বাসা থেকে ভাঙারি মালামালের সঙ্গে বিক্রি করা হয়েছিল। সেই সূত্র ধরে সন্দেহ ঘনীভূত হয় পরিবারের সদস্যদের ওপর।
সিআইডির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,এটি ছিল অত্যন্ত জটিল ও ক্লুলেস মামলা। আসামিরা এমনভাবে ঘটনা সাজিয়েছিল যেন সবাই মনে করে ভিকটিম স্বেচ্ছায় কোথাও চলে গেছেন। কিন্তু প্রযুক্তিগত তথ্য, মোবাইল ট্র্যাকিং এবং দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে আমরা সত্য উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হই। পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ময়মনসিংহ থেকে সাইফুল ইসলাম ওরফে রাজন ওরফে রাজুকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হন জিয়াউর রহমান ওরফে সাগর ও আশিকুর রহমান টিপু। রিমান্ডে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে বেরিয়ে আসে হত্যার পুরো বর্ণনা। পরে আসামিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পুকুরের মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা হয় মা ও শিশুপুত্রের কঙ্কাল। সিআইডি জানিয়েছে, গ্রেপ্তার তিন আসামিই আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। উদ্ধার হওয়া কঙ্কাল ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
ঘটনাস্থলে ভিড় করা শত শত মানুষকে চোখ মুছতে দেখা যায়। অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সম্পত্তির জন্য মানুষ কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, এই ঘটনা তার ভয়ঙ্কর উদাহরণ। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক, যাতে ভবিষ্যতে কেউ সম্পত্তির লোভে আর কোনো নিরীহ মা ও শিশুর জীবন কেড়ে নিতে সাহস না পায়।
আপনার মতামত লিখুন :