
মোহাম্মদ হানিফ স্টাফ রিপোর্টার : দেশের অন্যতম প্রবাসী অধ্যুষিত উপজেলা সোনাইমুড়ী। রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের দানের টাকায় পরিচালিত হয় এখানের অধিকাংশ মাদ্রাসা-এতিমখানার মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এর পাশাপাশি সোনাইমুড়ীর বেশ কয়েকটি এতিমখানায় সরকারি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে এতিমদের সেই ক্যাপিটেসন গ্রান্টের (নিবন্ধন প্রাপ্ত বেসরকারি এতিমখানাসমূহে শিশুদের প্রতিপালনের জন্য সরকারি আর্থিক সহায়তা) টাকায় থাবা বসিয়েছে অসাধুচক্র। কাগজে-কলমে এতিমদের ভুয়া তালিকা ও জাল বিল-ভাউচারে টাকা তুলে নিচ্ছেন এসব মাদ্রাসা-এতিমখানার দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা।
সোনাইমুড়ীর ১৮টি এতিমখানার মধ্যে সরকারি সহায়তা পাচ্ছে ১৩টি। যাদের মধ্যে সোনাইমুড়ী ফয়েজিয়া এতিমখানা, পাঁচবাড়িয়া আহম্মদিয়া এতিমখানা, জামেয়া ইসলামিয়া ইহাইয়া উল উলুম এতিমখানা, মকিল্যা নূরানী হাফেজিয়া এতিমখানা, এই চার প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ করেছেন প্রতিবেদক। অনুসন্ধানে সবগুলো এতিমখানায় বিল-ভাউচার ও এতিমের তালিকায় বড় ধরনের জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে।
জালিয়াতির শীর্ষে ফয়েজিয়া এতিমখানা
জালিয়াতির শীর্ষে রয়েছে সোনাইমুড়ী ফয়েজিয়া এতিমখানা। জুলাই আন্দোলনের পূর্বে আওয়ামী ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন এতিমখানার সভাপতি। আর জুলাই বিপ্লবের পর সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের আরেক প্রভাবশালী নেতা। তবে সেক্রেটারীর কোনো পরিবর্তন নেই। পদাধিকার বলে ক্ষমতার বলয়ে দীর্ঘদিন থেকে এতিমখানার মোহতামিম ও পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারীর দায়িত্বে রয়েছেন মোঃ শফিকুর রহমান।
বছরের পর বছর থেকে এতিমদের তালিকায় বড় ধরনের কারচুপির অভিযোগ রয়েছে ফয়েজিয়া এতিমখানার পরিচালকদের বিরুদ্ধে। সোনাইমুড়ী উপজেলা সমাজসেবা অফিসের দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরে ফয়েজিয়া এতিমখানায় আবাসিক-অনাবাসিকসহ মোট ১৯০ জন এতিম ছিল। ওই অর্থ বছরে দুই ধাপে ১৪৬ জন এতিমের জন্য বরাদ্দ আসে। তবে জুলাই আন্দোলনে দেশের পট পরিবর্তনের পর ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরের এতিমখানা পরিদর্শন প্রতিবেদনে সেই সংখ্যা দেখানো হয় ১০৮ জন। এক অর্থ বছরের ব্যবধানে ফয়েজিয়া এতিমখানার তালিকা থেকে গায়েব হয়ে যায় ৮২ জন এতিমের একটি বড় সংখ্যা। তবে এর পরপরই ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে আবার ১০৮ থেকে এতিমদের সংখ্যা ১৫৬ তে এসে দাঁড়িয়েছে।
এছাড়া দালিলিক প্রমাণে দেখা যায় মাদ্রাসার এতিমদের জন্য দেওয়া বরাদ্দের টাকা হাতাতে ওষুধ, পোশাক, জুতা, মুদি-মনিহারি, কাঁচা বাজারের ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে বছরের পর বছর সমাজসেবা অফিসে জমা দিয়েছেন এতিমখানার মোহতামিম মোঃ শফিকুর রহমান।
ফয়েজিয়া এতিমখানার উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের গত তিন বছরে জমা দেওয়া ওষুধ, পোশাক, বাজার ও মুদি-মনিহারি ক্রয়ের বিল-ভাউচারে বড় ধরনের জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। বিল-ভাউচারে উপস্থাপিত কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। কিছু প্রতিষ্ঠানের নাম ঠিকানা সঠিক থাকলেও ভাউচার জাল। আবার এতিমখানার সেক্রেটারী নিজের মোবাইল নাম্বার ব্যবহার করেই তৈরি করেছেন অস্তিত্ববিহীন প্রতিষ্ঠানের ক্যাশ মেমো।
বিল-ভাউচারে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারী থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ‘ফয়সল ড্রাগ হাউজ’ নামক একটি ফার্মেসী থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকার ওষুধ ক্রয় করা হয়েছে এতিমখানার পক্ষ থেকে। প্রতিটি ভাউচারে ৮-১০ হাজার টাকার অ্যান্টিবায়োটিকসহ বিভিন্ন ওষুধের হিসাব লেখা হয়েছে। তবে বিলগুলো যাচাই করতে ওই প্রতিষ্ঠানে গেলে সব বিল জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরীকৃত বলে দাবি করেছেন ফয়সল ড্রাগ হাউজের স্বত্বাধিকারী মোঃ ফয়সাল। তাদের প্রতিষ্ঠানের এমন কোনো বিল-ভাউচার নেই বলে জানান তিনি।
এতিমখানা থেকে মুদি-মনিহারি ক্রয়ের কয়েক লক্ষ টাকার বিল-ভাউচার দেখানো হয়েছে সোনাইমুড়ী স্টেশন রোডের ‘মেসার্স আকবর স্টোর’ এর নামে। তবে আকবর স্টোরের মালিক মোঃ হাফেজ শাহ আলম এই সকল ভাউচার জাল বলে শনাক্ত করেন।
শুধু ২০২৫ সালেই এতিমদের জন্য ‘আনোয়ার ক্লথ স্টোর’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক লাখ টাকার পোশাক, জুতা, গামছা, মশারি ইত্যাদি ক্রয়ে বিল-ভাউচার দেখানো হয়েছে ফয়েজিয়া এতিমখানা থেকে। তবে সেই বিলে উল্লেখিত সোনাইমুড়ী ব্যাংক রোডের ঠিকানায় ওই নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের হদিস মেলেনি। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, এই নামের একটি প্রতিষ্ঠান ১২ বছর পূর্বে মার্কেট থেকে দেউলিয়া হয়ে চলে গেছে।
ফয়েজিয়ার এতিমদের জন্য কাঁচাবাজার, মাছ ও মাংস ক্রয়ের বিল-ভাউচারে মেসার্স মোহাম্মদীয়া বাণিজ্যালয় নামক প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। ঠিকানা দেওয়া হয়েছে রেল গেইট সোনাইমুড়ী কাঁচা বাজার। বাজারের শুরু থেকে শেষ মাথা পর্যন্ত খুঁজেও এমন কোনো দোকানের অস্তিত্ব মেলেনি। এই বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, তারা এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম আগে শোনেনি। পরে ওই ক্যাশ মেমোতে দেওয়া রবি নাম্বারে কল দেওয়া হয় যার শেষ তিন সংখ্যা ৭৭৭। পরে ট্রু-কলার অ্যাপে মোবাইলের স্ক্রীনে এতিমখানার মোহতামিম ও সেক্রেটারী মোঃ শফিকুর রহমানের ছবি ভেসে ওঠে।
এই সকল অনিয়মের বিষয়ে ফয়েজিয়া এতিমখানার মোহতামিম ও সেক্রেটারী মোঃ শফিকুর রহমানের সাথে কথা হলে তিনি বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন।
জামেয়া ইসলামিয়া এতিমখানা: প্রবাসীর সন্তান ‘এতিম’ তালিকায়, ভাউচার পুরোটাই ভুয়া দুর্নীতি ও জালিয়াতির দৌড়ে পিছিয়ে নেই আমিশাপাড়া ইউনিয়নের জামেয়া ইসলামিয়া ইহাইয়া উল উলুম মাদরাসা ও এতিমখানা। প্রতিষ্ঠানটির এতিমখানা শাখার পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারী মাওলানা কবির আহম্মেদ ও ক্যাশিয়ার মাওলানা বেল্লাল আপন চাচাতো ভাই হওয়ায় অনিয়ম আর জালিয়াতি চলছে দুর্বার গতিতে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরের তালিকা অনুযায়ী জামেয়া ইসলামিয়া ইহাইয়া উল উলুম এতিমখানায় এতিম নিবাসী রয়েছেন ৮৮ জন। সরেজমিনে গিয়ে, মাদ্রাসার এতিমদের দেখতে চাইলে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সকল শিক্ষার্থীদের উপস্থিত করেন। পরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের দেওয়া এতিমদের তালিকা ধরে উপস্থিতি গণনা করলে সেখানে তালিকাভুক্তদের মাত্র ৩ জনকে উপস্থিত পাওয়া যায়। যার মধ্যে তালিকার ৮৪ নাম্বারে থাকা আসেক এলাহি ও ৮২ নাম্বারের আশিক বিন সাইফুল দুজনের পিতা প্রবাসী। এই দুই কিশোর মাদ্রাসার বেতন ও অন্যান্য খরচ দিয়েই পড়াশোনা করছে। তালিকার মধ্যে মাত্র একজন প্রকৃত এতিম পাওয়া যায়। বাকি ৮৫ জনের নাম ডাকা হলেও তাদের উপস্থিতি মেলেনি এতিমখানায়। এছাড়া এতিমখানায় ওষুধ, পোশাক, খাবার, বাজার, মুদি-মনিহারি ও শিক্ষা সামগ্রীর জন্য খরচ দেখিয়ে সমাজসেবা অফিসে জমা দেওয়া বিল-ভাউচারের পুরোটাই জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরীকৃত।
তথ্যে দেখা যায়, জামেয়া ইসলামিয়া ইহাইয়া উল উলুম এতিমখানার শিশুদের জন্য ওষুধ ক্রয় করা হয়েছে উত্তর বাজার আমিশাপাড়ার জনী ফার্মেসী থেকে। ২০২৫ সালে জানুয়ারী থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২টি ভাউচারের প্রতিটিতে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকার ওষুধ ক্রয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে। যার অধিকাংশ ভাউচারে একই সাথে প্যারাসিটামল গ্রুপের নাপা, এইস ও রেনোভা ট্যাবলেট ক্রয় করা হয়েছে।
এতিমদের জন্য লুঙ্গি, গেঞ্জি, পাঞ্জাবি, টুপি ক্রয়ে বিল-ভাউচার দেখানো হয়েছে আমিশাপাড়া আজিজ সুপার মার্কেটের রাজমনি গার্মেন্টস এর। আমিশাপাড়া দক্ষিণ বাজারের মেসার্স মনসুর আলী স্টোর থেকে প্রতিমাসে ২১-২২ হাজার টাকার মুদি মালামাল ক্রয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে। আমিশাপাড়া পশ্চিম বাজারের হামিদিয়া লাইব্রেরী এন্ড স্টেশনারী থেকে প্রতিমাসে সাদা কাগজ, রোল কাগজ ও কলম ক্রয় বাবদ ৫ হাজার টাকার বিল দেখানো হয়েছে। এছাড়া আমিশাপাড়া দক্ষিণ বাজারের মেসার্স আলী হোসেন ফিস থেকে পাঙ্গাস, তেলাপিয়া মাছ, মেসার্স ওহাব গোস্ত দোকান থেকে গোশত, মেসার্স আবুল কাশেম “ছ” মিল থেকে প্রতি মাসে ৪ হাজার টাকার জ্বালানী কাঠ ও এয়াকুব আলী সবজি দোকান থেকে কাঁচা বাজার ক্রয়ের তথ্য দেওয়া হয়েছে। যার প্রতিটি বিল-ভাউচারে জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে।
এতিমখানায় তালিকাভুক্ত ৮৫ জন শিশুর অনুপস্থিতি, প্রবাসীদের সন্তানদের নাম এতিমদের তালিকায় থাকা এবং ওষুধ ক্রয়ের ভাউচারের অস্বাভাবিক তথ্যের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয় প্রতিষ্ঠানের মোহতামিম ও এতিমখানা পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারির দায়িত্বে থাকা মাওলানা কবির আহম্মেদের কাছে। তিনি বলেন, “এতিমদের অনেকে ছুটিতে আছে। আর ওষুধ ক্রয়ে কোনো অস্বাভাবিকতা কিংবা অনিয়ম হয়নি। প্রয়োজনে বিল-ভাউচারে থাকা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে খোঁজ নিতে পারেন।” এছাড়া এতিমখানা বিষয়ে কমিটির সভাপতি মোঃ ইব্রাহীমের সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি দীর্ঘদিন থেকে অসুস্থ আছেন বলে জানান মাওলানা কবির আহম্মেদ।
পরে সরেজমিনে আমিশাপাড়ার জনী ফার্মেসীতে গিয়ে জানা যায়, ওষুধ ক্রয়ের বিল-ভাউচারটি জাল। ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক আবদুর রশিদ জনি জানান, তাদের দোকানের এমন কোনো বিল-ভাউচার নেই। আমিশাপাড়া আজিজ সুপার মার্কেটের রাজমনি গার্মেন্টস নামক প্রতিষ্ঠানে গেলে স্বত্বাধিকারী ইসমাইল হোসেন জানান, মেমোতে দেওয়া নাম ঠিকানা তাদের প্রতিষ্ঠানের সাথে মিললেও এই মেমো তাদের নয়। এটি জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। তাদের প্রতিষ্ঠানের এমন কোনো বিল-ভাউচার নেই। এছাড়া মুদি মালামাল ক্রয়ের প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমিশাপাড়া দক্ষিণ বাজারের মেসার্স মনসুর আলী স্টোর সহ অন্যান্য সকল প্রতিষ্ঠানের নামে প্রস্তুতকৃত বিল-ভাউচার তৈরীতেও জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে।
একই হাতের লেখায় চার প্রতিষ্ঠানের ভাউচার
একই অবস্থা দেখা যায় সোনাইমুড়ীর বারগাঁও ইউনিয়নের মকিল্যা নুরানী হাফিজিয়া এতিম খানায়। ওই প্রতিষ্ঠানে বর্তমান এতিম নিবাসীর সংখ্যা তালিকা অনুযায়ী ১২ জন। নোয়াখালী জেলা সমাজসেবা অফিসের সরবরাহ করা তালিকা ধরে উপস্থিতি যাচাই করেন প্রতিবেদক। সেসময় তালিকার ৫ নাম্বারে থাকা আমানতকে উপস্থিত পাওয়া যায়। বাকি ১১ জন এতিমকে অনুপস্থিত পাওয়া যায়।
এই এতিমখানার সকল বিল-ভাউচার যাচাই করেও একই ধরনের দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটি সোনাইমুড়ী হাইস্কুল রোডের মেসার্স প্রীতম মেডিকেল হল থেকে ওষুধ ক্রয়ের বিল-ভাউচার দেখিয়েছে। সেখানে ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ১ তারিখে এজিথ নামে ৩৫ টাকা দরে ৮০ পিস ওষুধ ক্রয় দেখিয়ে ২ হাজার ৮০০ টাকা বিল করা হয়। যা ছিলো মূলত ম্যাক্রোলাইড শ্রেণীর অ্যান্টিবায়োটিক। যা শ্বাসতন্ত্র, ত্বক, কান ও যৌনবাহিত ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
কোন চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রের ভিত্তিতে এবং কোন কোন শিশুকে এই ৮০ পিস অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছে সেই প্রশ্ন রাখা হয় এতিমখানার মোহতামিম মুফতি মোঃ রফিকুল্লাহর কাছে। তিনি জানান, এতিমখানায় ৪-৫ মাস হয়েছে তিনি এসেছেন। কোনো কিছুর হিসাব তিনি রাখেন না। আয়-ব্যয়, বিল-ভাউচার ও অর্থ উত্তোলন করেন এতিমখানা পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ জসিম উদ্দিন। মোহতামিম মোঃ রফিকুল্লাহ মুঠোফোনে কল দিয়ে জসিম উদ্দিনকে এতিমখানায় ডাকলে তিনি আসছেন জানিয়ে আর আসেননি। পরে প্রায় ঘণ্টা খানেক অপেক্ষা ও বেশ কয়েকবার কল দেওয়া হলেও জসিম উদ্দিন এতিমখানায় আসেননি।
মকিল্যা নুরানী হাফিজিয়া এতিম খানার পক্ষ থেকে সমাজসেবা অফিসে জমা দেওয়া হয়েছে ফাতেমা বস্ত্র বিতান, মেসার্স আপন স্টোর, মেসার্স প্রীতম মেডিকেল হল ও শহিদ ফেব্রিক্স এর বিল-ভাউচার। এর প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন ঠিকানার হলেও সবগুলো ভাউচারের হাতের লেখা হুবহু এক।
বন্ধ দোকান ও প্রবাসীদের নামে ভুয়া ভাউচার
জালিয়াতির তালিকা থেকে বাদ পড়েনি সোনাইমুড়ী বাংলা বাজার এলাকার পাঁচবাড়িয়া আহমাদিয়া এতিমখানা। সেখানেও ভুয়া এতিমের তালিকা ও জাল বিল-ভাউচারের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এতিমখানার পরিচালনা কমিটির দায়িত্বে থাকা সভাপতি মাকসুদুর রহমান পাটওয়ারীর পরিচালিত প্রতিষ্ঠান মাহী এন্টারপ্রাইজের নামে মুদি মালামালের ভুয়া ভাউচার তৈরি করা হয়েছে। যার প্রতিটি ভাউচারে ৩০-৩৫ হাজার টাকার মালামাল ক্রয়ের হিসাব দেখানো হয়েছে।
২০১২ সালে আমেরিকায় চলে যাওয়া বাংলা বাজারের ফিরোজ আলমের ইসলাম মেডিকেল হলের ভাউচার আজও ব্যবহার করছে পাঁচবাড়িয়া আহমাদিয়া এতিমখানা। বিল-ভাউচার বলছে বাংলা বাজার হাই স্কুল রোডের রাজধানী ফ্যাশন থেকে এতিমদের জন্য সেন্ডেল, বিছানা, পায়জামা, লুঙ্গি ক্রয় করেছে এতিমখানাটি। তবে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নাম রাজধানী ফ্যাশন থাকলেও সেখানে কেক-বিস্কুট বিক্রি করা হচ্ছে। ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক জানান, তারা একসময় পোশাক বিক্রি করলেও তাদের এই ধরনের কোনো বিল-ভাউচার ছিল না।
এছাড়া এতিমখানার ভাউচার বুক যাচাই করে দেখা যায় ওই খাতায় হিসাব সম্পাদন করেন মাদ্রাসার জেনারেল শিক্ষক মিনহাজুল ইসলাম। তিনি স্বীকার করেন মাহী এন্টারপ্রাইজ, রাজধানী ফ্যাশনের বিল-ভাউচার তিনি সম্পাদন করেছেন।
প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ৪৫ জন এতিম নিবাসীর উল্লেখ থাকলেও সেখানে মাত্র ৭ জনের উপস্থিতি পাওয়া যায়। যার মধ্যে এতিম তালিকার ২ নাম্বারে থাকা জিহাদের বাবা জাহাঙ্গীর ওমান প্রবাসী, ৩৫ নাম্বারের আব্দুর রহমানের বাবাও বিদেশে থাকেন। ৩ ও ৪ নং তালিকার আব্দুর রহমান এবং আব্দুল আজীজ আহম্মেদের বাবা হাফেজ শাহজাহান ওই মাদ্রাসার শিক্ষক। ৩৪ নাম্বার তালিকার আলী বিন জামালের বাবা মোঃ জামাল উদ্দিন ঢাকায় ব্যবসা করেন। তবে ১১ নাম্বারে ইউসুফ হাসান প্রকৃত এতিম ও ১৬ নাম্বারে থাকা মোঃ সাইমুন দরিদ্র পরিবারের সন্তান।
এবিষয়ে কথা হলে পাঁচবাড়িয়া আহমাদিয়া এতিমখানার সেক্রেটারী আ: রশিদ জানান, অনিয়মের বিষয়ে তার কিছু বলার নেই। তবে এতিমদের টাকা মাদ্রাসার ছাত্রদের জন্যই খরচ করা হয়েছে। ব্যক্তি স্বার্থে কোনো টাকা খরচ করা হয়নি।
আইনানুগ ব্যবস্থার আশ্বাস
এতিমখানার সরকারি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির বিষয়ে বিস্তারিত কথা হয় নোয়াখালী জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক জেড এম মিজানুর রহমান খানের সাথে। তিনি বলেন, “এতিমের টাকা আত্মসাৎ করলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। প্রতিবেদনে অনিয়মের তথ্য পেলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। এতিমের অর্থ আত্মসাৎ বা অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তর ও বর্তমান সরকার শক্ত অবস্থানে রয়েছে। সত্যতা পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
আপনার মতামত লিখুন :