
উপজেলা সংবাদদাতা, হাতিয়া :: হাতিয়া উপজেলার হরণী ইউনিয়নের নবীপুর বাজার দাখিল মাদ্রাসার সভাপতি ও পরিচালক মাওলানা আনসারুল হকের বিরুদ্ধে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, প্রতিষ্ঠানের অর্থের হিসাব, নিয়োগে অনিয়ম এবং এক শিক্ষককে চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
এসব বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও নির্ধারিত শুনানিতে আনছারুল হক বারবার অনুপস্থিত থেকেছেন বলে দাবি অভিযোগকারীদের। তাঁরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ২০১০ সালে প্রয়াত মুহাদ্দিস রুহুল আমিন (রহ.)-এর স্মৃতি ও আদর্শকে কেন্দ্র করে নবীপুর গ্রামে মুহাদ্দিস রুহুল আমিন (রহ.) ফাউন্ডেশন মডেল দাখিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা, কমিটি গঠন ও নাম পরিবর্তন নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের দাবি, মাদ্রাসার দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা আনছারুল হক একপর্যায়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন এবং প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করা হয়। তবে এসব দাবির সত্যতা যাচাইয়ে প্রতিষ্ঠাকালীন দলিল, নিবন্ধন ও কমিটির অনুমোদনসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন।
মাদ্রাসার সাবেক সহকারী শিক্ষক মো. তোফায়েল আহমেদ গত ১৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ইউএনওর কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, জমি-সংক্রান্ত কাগজপত্র তৈরির কথা বলে তিন লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এ ছাড়া ভাউচারের মাধ্যমে ২০ হাজার টাকা আত্মসাৎ, প্রতিষ্ঠানের জন্য দেওয়া রিংকলাপ অন্যত্র বিক্রি, গাছ লাগানোর নামে অর্থ ব্যয় এবং যাতায়াত খরচ দেখিয়ে টাকা উত্তোলনের অভিযোগও করেন তিনি।
ওয়াজ মাহফিলের সময় স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ধান-চালের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই শিক্ষক। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তোফায়েল আহমেদের অভিযোগ, ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি মাদ্রাসায় যোগ দিয়ে তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেন। অনিয়মের প্রতিবাদ করায় তাঁর বেতন কমিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, ২০২৬ সালের ১১ জুন পর্যন্ত পাঠদান করলেও ১৪ জুন বকেয়া আট মাসের ৩২ হাজার টাকা চাইতে গেলে তাঁকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার কথা জানানো হয়। এ বিষয়ে তাঁকে কোনো লিখিত নোটিশ বা সিদ্ধান্তের কপি দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর পদে তিন লাখ টাকার বিনিময়ে অন্য শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন তোফায়েল।
অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই প্রথম অভিযোগ দেওয়ার পর একাধিকবার শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হলেও তা পরিবর্তন হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হলে আনছারুল হক নিজে উপস্থিত না থেকে আবদুল মাজেদকে পাঠান বলে তাঁদের অভিযোগ।
মুহাদ্দিস রুহুল আমিন (রহ.) ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এএইচএম জিয়াউল ইসলাম বলেন, প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা, সম্পদ ও অর্থের হিসাব নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র ও আর্থিক নথি যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানান তিনি।
সাবেক শিক্ষক তোফায়েল আহমেদও তাঁর বকেয়া বেতন ও চাকরিসংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তির পাশাপাশি অভিযোগগুলোর তদন্ত দাবি করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে মাওলানা আনসারুল হক বলেন, “আমি অসুস্থ থাকায় শুনানিতে উপস্থিত হতে পারিনি। আমার লোক গিয়েছিল, সে অভিযোগের তদন্ত দিয়েছে।” একাধিক অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি জানি না, আমার কাছে কোনো নোটিশ আসেনি।” মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা, সভাপতি ও পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছে, তাই তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে শুনানির নথি, কমিটির অনুমোদন, জমির দলিল, আয়-ব্যয়ের হিসাব ও শিক্ষক নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগের সত্যতা না মিললে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
আপনার মতামত লিখুন :