
উপজেলা প্রতিনিধি, সোনাইমুড়ী: সোনাইমুড়ী উপজেলার বুকচিরে একসময় প্রবাহিত ছিল ভুলুয়া খাল। ভূমিদস্যুদের বেপরোয়া দখল ও দৌরাত্ম্যে ভুলুয়া এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। খালের ওপরে প্রথমে টং দোকান, পরবর্তীতে স্থায়ী স্থাপনা এবং পর্যায়ক্রমে মার্কেট নির্মাণ করে খালটি দখল করেই চলেছে একশ্রেণীর অবৈধ দখলদার। স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রটি সরকারি জায়গা গিলে খেলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নীরব। একসময়ের প্রশস্ত খাল ভরাট-দখল হয়ে নর্দমায় পরিণত হলেও কখনো পরিচালিত হয়নি উচ্ছেদ অভিযান।
পানি উন্নয়ন বোর্ড দীর্ঘদিন থেকে খনন করে না ভুলুয়া খালটি। এছাড়াও অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে নেয়া হয়নি কার্যকর পদক্ষেপ। উচ্ছেদ অভিযানেও আগ্রহ নেই তাদের। যে কারণে খাল দখল করে একের পর এক স্থাপনা নির্মাণ করেছে স্থানীয় ভূমিদস্যু চক্রটি। এতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ছে। ফলে ক্ষতির সম্মখীন হচ্ছেন কৃষকেরা, সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। এ বিষয়ে স্থানীয়রা একাধিকবার অভিযোগ করেও সুফল পায়নি।
জানা যায়, সোনাইমুড়ীর একটি পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ভুলুয়া খালটি। বৃহত্তর নোয়াখালীর বাণিজ্যিক কেন্দ্র চৌমুহনী বাজার থেকে সোনাইমুড়ী বাজারের পণ্য পরিবহন ও যাতায়াতে এই খাল ব্যবহৃত হতো। সোনাইমুড়ী বাজার হয়ে রামগঞ্জ, চাঁদপুর, হাজীগঞ্জ সহ উপজেলার বিভিন্ন ছোট-বড় বাজারে নৌকায় করে মালামাল পরিবহন করা হতো এই খালের মাধ্যমে।
যেটি এখন ভূমিদস্যুদের দখলে। আর এ কারনে বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে এলাকার ফসলিজমি ও বাড়িঘর ডুবে যাচ্ছে।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, (বেগমগঞ্জ-সোনাইমুড়ী) ভুলুয়া খালের দৈর্ঘ্য ১০.৭৫০ কিলোমিটার। চেইনেজ ১০ কিলোমিটার খালটি সম্প্রতি পানি উন্নয়ন বোর্ড খনন করে। তবে সোনাইমুড়ী বাজার হয়ে ৫০০ মিটার খাল খনন হয়নি। পৌর এলাকার স্টেশন হয়ে চৌরাস্তা পর্যন্ত, কুমিল্লা সীমান্ত হয়ে চৌমুহনী পর্যন্ত খালগুলো খননের আওতায় আসেনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, সোনাইমুড়ী পৌর এলাকার গদাধর কুন্ড সংলগ্ন খালটি দখল করে বাড়ি ও হাসপাতাল নির্মাণ করেছেন স্থানীয় মহিলা কমিশনার আলেয়া বেগম। সোনাইমুড়ী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ সংলগ্ন খালের দুইপাশ দখল করে বাড়ি নির্মাণ করেছেন মনির হোসেন, আলী টাওয়ার নামের একটি মার্কেট নির্মাণ করেছেন আবুল কাশেম, তার পাশেই নির্মিত হয়েছে ৪তলা বিশিষ্ট মার্কেট মদিনা প্লাজা যেটির মালিক মোঃ শাহ আলম। এছাড়া কৌশ্যালার বাগ গ্রামের আব্দুল মন্নান, ফারুক, রুহুল আমিনসহ একটি চক্র খাল দখল করে বিভিন্ন মার্কেট ও দোকানপাট নির্মাণ করেছেন।
দখল চক্রের আরেকটি গ্রুপ অভিনব পন্থায় দখল করছে সড়ক ও খালের জমি। সড়ক ও জনপদ বিভাগের আওতাধীন জমি জেলা পরিষদ থেকে লিজ নিয়ে দখল করছে। লিজের শর্ত ভঙ্গ করে নির্মাণ করছে পাকা স্থাপনা ও মার্কেট।
একদিকে দখল অন্যদিকে খনন না হওয়ায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে কৃষিজমিতে। যে কারণে ফসলী জমি চাষের অযোগ্য হয়ে পতিত জমিতে পরিনত হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর আলম জানান, অনেক বছর ধরে খাল খনন না করায় সেচ-নির্ভর খাল খননের আবেদন জানিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড বরাবর কয়েকবার প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সে আবেদনে সাড়া মেলেনি। এখানে জলাবদ্ধতা একটি বড় সমস্যা। মৌসুমে জলাবদ্ধতা বেশি থাকে। যার কারণে মৌসুমে পতিত হিসেবে জমি পড়ে থাকে।
স্থানীয়দের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে সড়ক ও জনপদ বিভাগ, জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসক ও পানি উন্নয়ন বোর্ড এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অদৃশ্য ইশারায় কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা ও মার্কেট নির্মাণ করায় পানি নিষ্কাশন বন্ধের পথে। পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় কৃষক সহ এই উপজেলার কয়েক হাজার মানুষের দুর্ভোগ চরমে।
খাল দখল সম্পর্কে সোনাইমুড়ী উপজেলার নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আফম বাবুল বাবু বলেন, সোনাইমুড়ী বাজারের ভেতরের খালটি খনন হওয়া দরকার। খালের দু’পাশের মার্কেট ও দোকানের ময়লা-আবর্জনার কারনে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। খালটি খনন ও দখল মুক্ত করার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
সোনাইমুড়ী পৌর মেয়র নুরুল হক চৌধুরী জানান, বর্তমানে দখল-দূষণে খালগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় জলাবদ্ধতা হয়ে পৌর কার্যালয় ডুবে যায়। খালগুলো খনন করা জরুরী হয়ে পড়েছে।
সোনাইমুড়ীতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে অম্বর নগর-বগাদিয়া খাল, বাড্ডা থেকে-জোড়া পোল খাল সহ বেশ কয়েকটি শাখা খালের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে খনন করা হয়। তবে নির্বাচনের পূর্বে সোনাইমুড়ী বাজারের দখল উচ্ছেদের অভিযান বন্ধ করে দেওয়া হয়। যে কারনে ভুলুয়া খালের খনন সম্ভব হয়নি। ভুলুয়া খালটির দখলদারদের উচ্ছেদ করে খননের বিষয়ে জানতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুন্সী আমির ফয়সালকে কয়েকবার কল দিলেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
আপনার মতামত লিখুন :