• ঢাকা
  • শনিবার, ২০শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৬ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১৯ জুন, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ১৯ জুন, ২০২৬

বাবা মানেই বিশালত্বের এক অদ্ভুত মায়াবী প্রকাশ – রেজাউল করিম খোকন

বাবা শুধু একজন মানুষ নন, স্রেফ একটি সম্পর্কের নাম নয়। বাবার মাঝে জড়িয়ে আছে বিশালত্বের এক অদ্ভুত মায়াবী প্রকাশ। বাবা নামটা উচ্চারিত হয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে কোন বয়সী সন্তানের হৃদয়ে শ্রদ্ধা কৃতজ্ঞতা আর মানুষটি কতভাবে অবদান রেখে যান সন্তানের জন্য, যার চুলচেরা হিসাব করে কেউ বের করতে পারবেন না। বাবার কাঁধটা কি অন্য সবার চেয়ে বেশি চওড়া? তা না হলে কি করে সমাজ সংসারের এত দায়ভার অবলীলায় বয়ে বেড়ান বাবা। বাবার পা কি অন্য সবার চেয়ে অনে বেশি দ্রুত চলে? নইলে এতোটা পথ এত অল্প সময়ে কি করে এত শক্ত করে সব কিছু আগলে রাখেন বাবা। বাবার ছায়া …? সেটাও শেষ বিকেলের বটগাছের ছায়ার চাইতেও বড়। বড় যদি না হবে তবে জীবনের এতো উত্তাপ থেকে কি করে সন্তানকে সামলে রাখেন বাবা আর বাবার চোখ ? সেটাও কি দেখতে পায় কল্পনার অতীত কোন দূরত্ব। তা না হলে কি করে সন্তানের ভবিষ্যত ভাবনায় শঙ্কিত হন বাবা। সত্যি বলতে কি বাবাকে নিয়ে আমরা কেউই এমন করে কখনও ভাবি না। শুধু আমাদের বাবা, শত সাধারণের মাঝেও অসাধারণ হয়ে ওঠা আমাদের জনক, আমাদের অকাতরে ভালবেসে যান তার সামর্থ্যরে শেষ বিন্দুটুকু দিয়ে। উজাড় করে দেন তার সবকিছুই শুধু তার সন্তানের জন্য। তার যা কিছু আছে নিজের জন্য আর অবশিষ্ট রাখেন না কোনভাবেই। সবকিছু উজাড় করে দেয়ার পরও তাকে কোনভাবে নিঃস্ব বলে মনে হয় না। মনে হয় তিনি যেন পরম তৃপ্তিতে আরও পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। বরং শ্রমে ঘামে স্নেহে সন্তানকে তিলে তিলে বড় করে তুলতে সচেষ্ট বাবা মহান সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যেও ফরিয়াদ জানান তার সন্তানের মঙ্গলের জন্য। আর বাবার সেই আহবান হয়ত গর্বিত করে তোলে অন্তর্যামীকেও।

বাবা নিয়ে সব সন্তানের অনুভূতিটা সমান হয় না। আবার জীবনের নানা বাঁকে সব বাবাও হয়ত পারেন না সন্তানের প্রতি তাদের আরেকটু একইভাবে প্রকাশ করতে। তাই কখনও কখনও বাবা নামের সম্পর্কটার বিশালত্ব ভুলে যাই আমরা। আমাদের জনক হয়ে যান জন্মদাতা। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ভাবনায় বাবার ভূমিকাকেও খাটো মনে হয়। তবুও বাবা কিন্তু সন্তানের জন্য মঙ্গল কামনা করে যান তার জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত। প্রকাশভঙ্গি যাই হোক সন্তানের জন্য পৃথিবীটাকে বাসযোগ্য করে তুলতে চেষ্টার কোন কমতি থাকে না তার। তাই বাবা যাদের বন্ধু তারাই জানে, কি করে নিজের সব ভাবনাকে বাবার হাতে সঁপে দিয়ে হালকা হতে হয়। কি করে বাবার নির্ভরতার ছায়ায় থেকে, তার চোখে দেখা সুন্দর ভবিষ্যতটাকে নিজের করে নিতে হয়। অন্যদিকে বাবা যাদের কাছে দূরতম গ্রহের বাসিন্দা, তারা শত অর্জনের মাঝেও নিশ্চিতভাবেই বঞ্চিত হন অমোঘ এক পাপ্তি থেকে। বাবার সঙ্গে সন্তানের যে সহজ স্বাভাবিক সম্পর্ক তাতে দু’জনেরই কিছু না কিছু করার ব্যাপার রয়েছে। বাবা হয়ত সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে ক্লান্ত শরীর আর মন নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। সে ক্ষেত্রে ভালোবাসার বারতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে সন্তানকেই।

আবার সন্তান যখন মনের মাঝে ঘরবসতি গড়ে দিনে দিনে নিভৃতচারী হয়ে উঠছে, তখন তার ভাবনাগুলো ভাগাভাগি করতে সামনে এগোতে হবে বাবাকে। মনে রাখবেন, সন্তান যত বড়ই হোক না কেন তার অভিমান আর অবহেলার পরিমাণ যত বিশালই হোক বাবার স্নেহ সবসময় তার জন্য এক পরম আশ্রয়। বেঁচে থাকার আনন্দে, কষ্টের তীব্রতায়, কঠিন সমস্যায় বাবাই হয়ে ওঠেন বিপদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু বা সহায়। অন্যদিকে সন্তান হিসেবে আপনাকে ভাবতে হবে বাবার কথা। তার আবেগ অনুভূতি আর পরিণত বয়সের চাওয়া পাওয়াগুলোর দিকে বাড়তি নজর দিতে হবে। যে বয়সে স্কুল-কলেজে নতুন নতুন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সময়গুলো বেশ জমে উঠেছে সে সময়টাতে ভুলে যাওয়া চলবে না পুরনো বন্ধুকে। বরং পুরনো দিনের কথা মনে রেখে নিজের জীবনের এই খোলস ছাড়াবার মুহূর্তে যদি বাবাকেও সঙ্গী হিসেবে নেয়া যায়, তাহলে বরং চেনা বন্ধুরাও নতুন রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। সেই সঙ্গে জীবনের কঠিন পথে হোঁচট খাওয়ার ঝুঁকিটা কমে। আবার যারা পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে দিব্যি কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন আয় উপার্জন শুরু করেছেন তাদেরকেও সময় করে ভাবতে হবে বাবার কথা। অফিসের ব্যস্ততা আর নানা ঝামেলার মাত্রাটা যতই সীমা ছাড়িয়ে যাক না কেন বাড়িতে ফিরে যাবার সঙ্গে সঙ্গে কয়েক মিনিটের জন্য হলেও তার পাশে বসতে হবে গল্পের ঝুড়ি নিয়ে।

তাহলেই দেখবেন, কোথায় যেন দিব্যি মিলিয়ে যাবে তার মাথায় চেপে বসা যত চিন্তা আর টেনশনের বোঝা। মনে রাখবেন আপনার, আমার বাবা কিন্তু আমাদের কাছে বড় কোনো উপহার চান না। বরং ব্যস্ততার মাঝে বের করে নেয়া একটু সময় বাবাকে দিয়েই দেখুন না নিশ্চিত করে বলে দেয়া যায়, এমন কোনো বাবা নেই যিনি সন্তানের এই সান্নিধ্যটুকু উপভোগ করেন না। অন্যদিকে জীবনের অমোঘ নিয়মে যারা বহুদিন আগেই হারিয়েছেন তাদের সন্তানরাও কিন্তু বাবাকে ভালবেসে করতে পারেন অনেক কিছু। এটা হতে পারে বাবার জন্য মহান সৃষ্টিকতার কাছে প্রার্থনা করা কিংবা বাবার অপূর্ণ ইচ্ছে আর বাবার আদর্শের বাস্তবায়ন। পিতার সহায় সম্পত্তির ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকার হিসেবে মানুষ যেভাবে সচেষ্ট হয়, নানা তৎপরতা চালায় বাবার আদর্শ ও মূল্যবোধের ধারকবাহক হতে মানুষ কেন তৎপর হয় না, সেটাই প্রশ্ন। এটা দুঃখজনক ব্যাপার সন্দেহ নেই।

সারাজীবনের সাধনায় বাবা আপনাকে যেখানে দেখতে চেয়েছিলেন বাবার মৃত্যুর পর সে জায়গায় যদি নিজেকে নিয়ে যেতে পারেন এবং উজ্জ্বল একটি অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, তবে সেটা বাবার প্রতি ভালোবাসা ও যথার্থ সম্মান দেখানো হবে বৈকি। ব্যস্ততার সাগরে ডুবে থাকা নাগরিক জীবনে আমাদের সব আবেগ অনুভূতিই ইদার্নীং বড্ড বেশি যান্ত্রিক হয়ে পড়ছে। কিন্তু তাই বলে বাবাকেও কি মনে করতে হবে বছরের নির্দিষ্ট একটি দিনে? বছরের একটি নির্দিষ্ট দিনেই শুধু নয়, বছরজুড়ে নানা কাজে কর্মে, আদর্শ বাস্তবায়নে তাকে স্মরণ করতে হবে শ্রদ্ধা ও ভালবাসায়। আমাদের নিত্য ব্যস্ততা আর অসর্তকতা যখন বাবার সঙ্গে তৈরি করে অদৃশ্য দূরত্ব তখন আমাদের জীবনটা ক্রমেই অর্থহীন হয়ে যেতে থাকে। এক্ষেত্রে আমাদের সবাইকে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করতে হবে বৈকি।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক

আরও পড়ুন

  • উপ সম্পাদকীয় এর আরও খবর