
মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার : “এক সেকেন্ডের ভিতর ইনজেকশনটা দেওয়ার সাথে সাথে আমার ছেলে বলছে- মা আমার হাত ফাডিজায়। শুধু একথাই বইলছে। আর ছেলের আর কোন কথা পাইনাই, আর কোন কথা বলেনাই। তখন সে আছরা আছরি শুরু কইচ্ছে। চোখ বড় বড় হই চোখের পানি অনবরত গেছে। এরপর ডাক্তার ডাকি আসেনা, চাইয়েনা। তারপর ঘুমের ইনজেকশন দিলে আমার ছেলের নাক-মুখদি শুধু সাদা ফেনা বাইরায়।” কাঁদতে কাঁদতে কথা গুলো বলছিলেন বিপুলাশার পূর্ব বাজারের বড়কাঁচি পাটোয়ারী বাড়ির রওশনআরা বেগম। কয়েক বছর পূর্বে জমিলা মেমোরিয়াল হাসপাতালের পরিচালক ডা: মাইনুল ইসলামের অপচিকিৎসার বর্ণনা দিতে গিয়ে বারেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছিলেন তিনি।
সাম্প্রতি প্রবাসী রোগীর মৃত্যু ও সেই ঘটনা ৪ লাখ টাকায় মিটমাট কান্ডে সোনাইমুড়ীতে সমালোচনার কেন্দ্রে রয়েছে জমিলা মেমোরিয়াল হাসপাতাল। এসকল বিষয় গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর ওই হাসপাতালের বিরুদ্ধে অপচিকিৎসার আরো তথ্য সামনে আসছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিযোগ তুলে ধরছেন ভুক্তভোগীরা। যাদের কয়েকজনের সাথে যোগাযোগ করেছেন এই প্রতিবেদক। যারা তাদের ও পরিবারের সাথে ঘটে যাওয়া অপচিকিৎসা ও হুমকি-ধমকির ঘটনা তুলে ধরে বিচারের দাবি জানিয়েছেন। তাদেরই একজন রওশন আরা বেগম।
তিনি জানান, ২৩ বছরের টগবগে ছেলে সাইফুল ইসলাম রাজুকে নিজের চোখের সামনে অপচিকিৎসায় মারা যেতে দেখেছেন। আহাজারি ছাড়া একমাত্র ছেলের মৃত্যুর সময় কিছুই করতে পারেননি।
জমিলা বলেন, ছেলে রাজুর জ্বরের জন্য ডা: মাইনুল ইসলামের কাছথেকে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলাম। চিকিৎসক তার হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দিয়ে ইনজেকশন লিখে দেয়। যথারীতি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর পরে ইনজেকশনটা শরীরে পুশ করার সাথে সাথে রাজুর অবস্থা খারাপ হতে থাকে। কিছু সময় পর তার মৃত্যু হয়। তবে বিষয়টি গোপন করে রাজুকে দ্রুত উন্নত চিকিৎসা দিতে হবে বলে হসপিটাল থেকে বের করে দেয়। কুমিল্লার এক হাসপাতালে নিয়ে জানতে পারি রাজুর অনেক আগেই মৃত্যু হয়েছে। অনেক কষ্টে কথাগুলো বলতে বলতে বারেবারে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছিলেন ৫০ উর্ধ্বো এই মা।
অপচিকিৎসায় নিহত রাজুর বড় বোন রেহেনা আক্তার জানান, তার ভাইয়ের মৃত্যুর কারন কি ছিলো তা আর কখনো জানতে পারেননি। এই বিষয়ে কথা বলতে গেলে ডা : মাইনুল ইসলাম বলেছেন তার চিকিৎসায় কোন ভুল নেই। বাড়াবাড়ি করলে রাজনৈতিক নেতাদের দিয়ে বিভিন্ন ভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। লাশ নিয়ে যাওয়া হবে বলে ভয় দেওয়া হয়। পরে তারা আর এই বিষয় নিয়ে কথা বলেননি। তবে এমন অপচিকিৎসার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে অনিয়মের পূনরাবৃত্তি ঘটবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ভুক্তভোগীদের আরেকজন রাকিবুল ইসলাম। তিনি জানান, সিজার করতে গিয়ে মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় তার কণ্যা সন্তানের ডান পায়ের হাড় ভেঙ্গে ফেলেন জমিলা মেমোরিয়াল হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক। গত বছরের ১৬ জানুয়ারী সন্তান সম্ভবা স্ত্রী নাসরিন আক্তারকে নিয়ে ভর্তি করেন হাসপাতালে। স্ত্রী বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডাঃ রাহমা সুলতানা সারিকার পরামর্শে সিজারের সিদ্ধান্ত নেন। রাত ১১টায় সিজারের জন্য অপারেশন থিয়েটারে প্রবেশের একঘন্টা পর কাপড় জড়িয়ে শিশুকে বেরকরা হয়।
ঘটনার বর্ণনায় রাকিবুল ইসলাম বলেন, ওটি থেকেই শিশু অবিরত কান্না করতে থাকে। পরে কাপড় সরিয়ে দেখা যায় পায়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা রয়েছে। হাসপাতালের ওটি নার্সদের কানাঘুষায় জানতে পারেন বাচ্চার ডান পা ভেঙ্গে গিয়েছে। পরে হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ মাইনুল ইসলাম এক্স-রে করে পা ভাঙ্গার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এরপরই রোগীকে চিকিৎসার অযুহাতে হাসপাতাল থেকে বেরকরে দেওয়ার পায়তারা করতে থাকেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। নানা ভাবে ঢাকায় উন্নত চিকিৎসার জন্য জোর করতে থাকেন তারা। একপর্যায়ে নিজেদের খরচে চিকিৎসা দেওয়া হবে জানিয়ে ঢাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
অভিযোগ করে রাকিবুল বলেন, নবজাতক শিশুকে নিয়ে কয়েকবার ঢাকা-নোয়াখালীর বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরেছি। খরচ হয়েছে প্রায় তিন লাখ টাকা। একটা পা ছোট আরেকটা পা বড় হয়ে আছে। এখনো বাচ্চার চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসার খরচের বিষয়ে কয়েকবার জমিলা মেমোরিয়াল কর্তৃপক্ষের দারস্থ হলে কর্মকর্তা মোঃ মোতালেব লোকজন দিয়ে হুমকি-ধমকি দেয়। বাধ্য হয়ে ডাঃ মাইনুল ইসলাম, ডাঃ রাহমা সুলতানা সারিকা ও মোঃ মোতালেবের বিরুদ্ধে সোনাইমুড়ী থানায় লিখিত অভিযোগ করি। পরে থানায় শালিসে রাজনৈতিক নেতাদের বসিয়ে মাত্র ৩০ হাজার টাকা দিয়ে মুখ বন্ধের হুমকি দেওয়া হয়। থানা থেকে বের হয়ে মোঃ মোতালেব অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এসব অপচিকিৎসা ও অবহেলার সাথে জড়িতদের বিচার দাবি করেছেন ।
জমিলা মেমোরিয়াল হাসপাতালে প্রবাসী মৃত্যুর ঘটনায় সোনাইমুড়ীর সংবাদ প্রচারকারী বিভিন্ন পেইজে ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। পোস্ট দেওয়া ভিডিওর কমেন্ট বক্সে এমন অসংখ্য ভুক্তভোগী মন্তব্য করেছেন। এদের মধ্যে নূর ইয়াসিন আরাফাত পাটোয়ারী লিখেছেন “এই ডা: মাইনুল ইসলামের অপচিকিৎসার কারনে ৫ মাস বয়সে পেটে থাকা অবস্থায় আমি আমার প্রথম সন্তান হারাই। পরে উনার হাসপাতালে প্রথমে ভুল ভাবে ডিএন সি করায় পরে উনার হাসপাতালে দ্বিতীয় বার ডি এন সি করায়। এতে আমার ওয়াইফ এর অনেক সমস্যা হয় দ্বিতীয়বার বাচ্চা কনসিভ করতে। জরায়ু ক্ষতি হওয়ার কারনে আমার অনেক মেডিসিন ইনজেকশন নিতে হয়। আমার প্রায় ৩০ হাজার প্লাস টাকা খরচ হয়। উনি আগে ছিলেন মেডিসিন ডা: আর পরে এখন গাইনি ডা: হয়। ব্যবসার জন্য কত কি করে মানুষ।”
ইয়াসিন আরাফাত নামে একজন মন্তব্য করেন যে তিনি দীর্ঘদিন এই হসপিটালে কর্মরত ছিলেন। তখন এটার নাম ছিলো মেডিকেয়ার হাসপাতালা। সেই সময়ের একটা ঘটনার বর্ণনা তিনি লেখেন- ২০১৮ সালে ছাতারপাইয়ার এক রোগী এই হসপিটালে মারা যায়। রোগীর লোকজন প্রতিবাদ করলে তাদেরকে অমানবিক ভাবে মারধোর করা হয়। তৎকালীন সময় হসপিটালটি তিন গ্রুপে ভাগ ছিলো। যার একাংশ ছিলো এমডি হানিফের, অন্য অংশ ডা: মাইনুল ইসলামের আরেক গ্রুপ ছিলো মুজাহিদ সাহেবের। তারা নিজেদের স্বার্থে রোগীর পকেট কাটতো।
অনলাইনে করা সকল মন্তব্যকারীদের সাথে যোগাযোগ করে সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। তবে বসন্তপুরের শিশু রাইসা, বিপুলাসার বাজারের রাজু কিংবা সম্প্রতি নিহত হওয়া যুবক পারভেজ নয় জমিলা মেমোরিয়ালে এমন অনেকেই অপচিকিৎসা ও অবহেলার শিকার হয়েছেন । তবে কখনই ভয়ভীতি, কখনো হুমকি আবার কখনো টাকার বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে সবকিছু। ফলে এই প্রতিষ্ঠান কিংবা, চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কখনই ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এছাড়া এই প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের বিরুদ্ধে দূর্নীতি সহ নানা অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যা উঠে এসেছে। তবে রহস্যজনক কারনে এই প্রতিষ্ঠানটি বরাবরই পার পেয়ে যাচ্ছে। তাই এসকল প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
এদিকে প্রবাসী যুবক পারভেজের মৃত্যুর ঘটনা ৪ লাখ টাকায় ধামাচাপা দেওয়া হলেও নোয়াখালী সিভিল সার্জন ডা: আনোয়ার হোসেন স্বপ্রণোদিত ভাবে ঘটনার তদন্তে সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার ইসরাত জাহানকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছেন। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন- সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আর এমও ডাক্তার রিয়াজ উদ্দিন এবং হাসপাতালের এনেস্থেশিয়া বিভাগের চিকিৎসক ডা. শফিক। কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।
এবিষয়ে প্রশ্ন করলে, তদন্ত চলমান রয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হলেন ডা: ইসরাত জাহান। তদন্ত শেষ হলে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে এই তদন্তকে ঘিরে কিছু নামসর্বস্ব গণমাধ্যম ও ফেসবুক পেইজে ভুয়া তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। “প্রাথমিক তদন্তে জমিলা হাসপাতালের ডাক্তারের ভুল চিকিৎসার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ওই হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক রোগীকে কোন চিকিৎসা ও এনেস্থেসিয়া দেয়নি।” এমন একটি বক্তব্য তদন্ত কমিটির সদস্য সচিব ও সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আর এম ও) ডাক্তার রিয়াজ উদ্দিনের নামে চালানো হচ্ছে।
এমন বক্তব্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে আর এম ও ডাক্তার রিয়াজ উদ্দিনের সাথে প্রতিবেদকের কথা হলে তিনি বলেন, “কোন গণমাধ্যমে এমন বক্তব্য তিনি দেননি। তদন্ত চলমান হয়েছে। এবিষয়ে সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানাবেন তদন্ত কমিটির প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার ইসরাত জাহান। অনেকেই ফোনকরে জানতে চেয়েছেন সকলকেই বলেছি তদন্ত চলমান রয়েছে। কারা কিভাবে এই বক্তব্য পেয়েছেন আমার জানা নেই।”
আপনার মতামত লিখুন :