• ঢাকা
  • রবিবার, ২৮শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১ ডিসেম্বর, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ১ ডিসেম্বর, ২০২৫

রক্তের ধর্ম নেই – ক্ষুদীরাম দাস

ছোটগল্প

রক্তের ধর্ম নেই

ক্ষুদীরাম দাস

গ্রামের নাম ছিলো সবুজগ্রাম। নামটাই যেন বলে দিতো, এখানে সবকিছু সবুজ। ধানের ক্ষেত, আমবাগান, পুকুরের চারপাশে শালুক-শাপলা, আর মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা ছোট্ট নদীটার নাম ছিলো চন্দনা। গ্রামের পুবদিকে হিন্দুপাড়া, পশ্চিমে মুসলিমপাড়া, উত্তরে ছোট্ট একটা গীর্জা আর দক্ষিণে আদিবাসীদের বাঁশের ঘর। কিন্তু চারপাশে এতো ভাগ-ভাগ থাকলেও শিশুদের কাছে এগুলো কখনো ভাগ ছিলো না।

রহিম মিয়ার বয়স তখন দশ। প্রত্যেক সকালে সে তার বাবার গোয়াল থেকে এক গ্লাস দুধ নিয়ে যেতো গোপাল দাসের বাড়ি। গোপাল দাসের মা বিধবা, ছেলে নেই। রহিমের বাবা বলতো, “দুধটা দিয়ে আয় বাবা, গোপাল কাকার মা একটু দুর্বল হয়ে গেছে।” রহিম দৌড়ে যেতো। গোপাল দাস তাকে দেখলেই হেসে বলতো, “আয় রহিম, বস্। আজ তোর জন্যে আমি দই পাতিয়েছি।” দু’জনে একসাথে বারান্দায় বসে দই-দুধ খেতো। তারপর একসাথে হেঁটে যেতো মক্তব আর পাঠশালার দিকে। মক্তবের কল থেকে পানি খেয়ে গোপাল যেতো তার স্কুলে, আর রহিম ফিরতো মক্তবে। কেউ কারো ধর্ম নিয়ে কিছু বলতো না।

গোপালের বয়সও দশ। সে জানতো না যে রহিমের বাবা হিন্দু গোয়ালার কাছ থেকে দুধ কিনে আনে। রহিমও জানতো না যে গোপালের বাবা মসজিদের পাশের দোকান থেকে চাল কিনে আনে। তাদের কাছে এসব ছিলো শুধুই খাবার, শুধুই ভালোবাসা।

বর্ষা এলো। চন্দনা নদী ফুলে উঠলো। একদিন বিকেলে গ্রামের শিশুরা সবাই মিলে নদীর ধারে খেলছিলো। হঠাৎ দেখা গেলো গোপালের ছোট বোন লতা পা পিছলে পড়ে গেছে পানিতে। চিৎকার শুরু হলো। রহিম তখন সবচেয়ে কাছে ছিলো। সে দু’হাতে লতাকে জড়িয়ে ধরলো আর কোনোমতে টেনে তুললো কিনারে। লতার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিলো। রহিমের বুক ধড়ফড় করছিলো। সে চিৎকার করে বললো, “আম্মা! গোপাল কাকা!” গোপাল দৌড়ে এলো। তার চোখে পানি। সে রহিমকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। “তুই আমার বোন বাঁচালি রহিম। তুই আমার ভাই।”

সেই দিন থেকে গোপালের বাড়ির দরজা রহিমের জন্যে সবসময় খোলা থাকতো। আর রহিমের বাড়ির দরজা গোপালের জন্যে।
বছির বিশ বছর পার হয়ে গেলো। রহিম এখন গ্রামের স্কুলের মাস্টার। গোপাল কলকাতায় চাকরি করে। কিন্তু প্রতি বছর দুর্গাপুজোর সময় গোপাল বাড়ি আসে। আসে রহিমের বাড়িতে। রহিমের মা তাকে দেখলেই বলেন, “আয় বাবা, তোর জন্যে পায়েস রেখেছি।” গোপাল হাসে। বলে, “আম্মা, তোমার পায়েস না খেলে আমার পুজো জমে না।”

কিন্তু দেশে এসে গেলো এক অদ্ভুত হাওয়া। শহর থেকে কিছু লোক এলো। তারা মাইক নিয়ে চিৎকার করতে লাগলো। “হিন্দু-মুসলিম আলাদা! এটা আমাদের দেশ! ওটা ওদের দেশ!” গ্রামের যুবকদের মধ্যে একটা অস্থিরতা শুরু হলো। কেউ কেউ বলতে লাগলো, “মসজিদের পাশে মন্দির থাকবে কেন?” কেউ বললো, “মন্দিরের পাশে মসজিদ কেন?”

রহিম শুনছিলো। তার বুকের ভিতরটা কেমন যেন হাহাকার করছিলো। সে গোপালকে চিঠি লিখলো। “ভাই, তুই একবার আয়। গ্রামটা বদলে যাচ্ছে।”
গোপাল ছুটি নিয়ে এলো। সে এসেই রহিমের সাথে বসলো বটগাছের নীচে। সেই বটগাছ, যার নীচে তারা শৈশবে একসাথে বিশ্রাম নিতো। গোপাল বললো, “রহিম, আমি শুনেছি। কিন্তু আমরা কী করবো?”

রহিম বললো, “যা আমরা ছোটোবেলায় করতাম। একসাথে থাকবো। একসাথে লড়বো। কিন্তু এবার লড়বো ঘৃণার বিরুদ্ধে।”
দু’জনে ঠিক করলো, তারা একটা স্কুল খুলবে। নাম হবে ‘সবুজগ্রাম মিলন স্কুল’। সেখানে হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান-আদিবাসী সব শিশু একসাথে পড়বে। কোনো ধর্মের নামে কোনো ভাগ থাকবে না।
কিন্তু কাজটা সহজ ছিলো না। যারা বিভেদ ছড়াচ্ছিলো, তারা রাতের অন্ধকারে স্কুলের ইটের গাঁথুনি ভেঙে দিতো। দেওয়ালে লিখে দিতো, “এটা হিন্দুর স্কুল হবে, না হলে কিছুই হবে না।” পরদিন আবার লেখা হতো, “এটা মুসলিমদের স্কুল। হিন্দুরা আসতে পারবে না।”

রহিম আর গোপাল রাত জেগে পাহারা দিতো। এক রাতে গোপাল ধরলো এক যুবককে। সে দেওয়ালে লিখছিলো। গোপাল চিনতে পারলো। সে তাদেরই পাড়ার রাজু। রাজু কাঁপছিলো। গোপাল তাকে জড়িয়ে ধরলো। বললো, “রাজু, তুই কেন এসব করছিস? তোর বাবা তো আমার বাবার সাথে একসাথে জমিতে কাজ করতো।”

রাজু কেঁদে ফেললো। বললো, “দাদা, আমাকে বলা হয়েছে, এটা না করলে আমি হিন্দু থাকবো না।”
গোপাল বললো, “যে তোকে বলেছে, সে কি তোর জন্যে কখনো রক্ত দিতে পারবে? সে কি তোকে বাঁচাতে পারবে?”
রাজু চুপ করে গেলো।

পরদিন গোপাল আর রহিম গ্রামের মাঠে একটা সভা ডাকলো। সেখানে এলো গ্রামের সবাই। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, আদিবাসী। রহিম দাঁড়ালো। বললো,
“আমরা যে দুধ খেয়ে বড়ো হয়েছি, সে দুধ হিন্দুর গোয়ালা দিয়েছে। যে চাল খেয়েছি, সে চাল মুসলিমের জমি থেকে এসেছে। যে পানি খেয়েছি, সে পানি মসজিদের কলে ছিলো, মন্দিরের পুকুরে ছিলো, গীর্জার কূপে ছিলো। আমরা কেউ কখনো জিজ্ঞেস করিনি, এটা কোন ধর্মের? কারণ এগুলো সবার। ঠিক তেমনি এই দেশও সবার। এই গ্রাম সবার।”
গোপাল উঠলো। বললো, “যখন আমার বোন নদীতে পড়েছিলো, রহিম তাকে বাঁচিয়েছিলো। সেদিন সে হিন্দু-মুসলিম ভাবেনি। সে শুধু ভেবেছিলো, একটা প্রাণ বাঁচাতে হবে। আজ যদি কোনো শিশু বিপদে পড়ে, তাকে বাঁচানোই আমাদের সবচেয়ে বড়ো ধর্ম।”

সেই দিন থেকে গ্রাম বদলে গেলো। যারা বিভেদ ছড়াতো, তারাও এলো। তারাও ইট তুলে দিতে লাগলো। স্কুলটা দাঁড়ালো। প্রথম দিন যখন শিশুরা এলো, তাদের হাতে ছিলো রঙিন ফুল। কেউ মসজিদ থেকে এনেছে, কেউ মন্দির থেকে, কেউ গীর্জা থেকে। সবাই মিলে একটা ফুলের মালা গাঁথলো। সেই মালা পরানো হলো স্কুলের গেটে।

আজও সবুজগ্রামে সেই স্কুল আছে। নাম এখনো ‘মিলন স্কুল’। প্রতি বছর দুর্গাপুজোর সময় গোপাল আসে। রহিমের বাড়িতে পায়েস খায়। ঈদের সময় রহিম যায় গোপালের বাড়ি। সেমাই খায়। ক্রিসমাসের সময় দু’জনে মিলে যায় গীর্জায়। বড়দিনের কেক খায়। আর পয়লা বৈশাখে আদিবাসীদের সাথে নাচে।
গ্রামের বুড়োরা বলে, “এই গ্রামে যতোদিন রহিম আর গোপাল থাকবে, ততোদিন কেউ এখানে বিভেদ ঢুকতে পারবে না।”

আর শিশুরা যখন জিজ্ঞেস করে, “দাদু, ধর্ম কী?”
বুড়োরা হাসে। বলে, “ধর্ম হলো একটা প্রাণ বাঁচানো। ধর্ম হলো একজনকে আশ্রয় দেওয়া। ধর্ম হলো একসাথে হাসা, একসাথে কাঁদা। বাকিটা সব মানুষের তৈরি নিয়ম।”

আর বটগাছটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে। তার ছায়ায় এখনো শিশুরা খেলা করে। কেউ বলে না, “তুই হিন্দু, তুই মুসলিম।” তারা শুধু বলে, “চল, খেলি।”
কারণ তারা জানে, এই গ্রাম সবার। এই দেশ সবার। যেমন সূর্য সবার, চাঁদ সবার, বাতাস সবার, তেমনি এই মাটিও সবার।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর