• ঢাকা
  • রবিবার, ২৮শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৬ ডিসেম্বর, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ৬ ডিসেম্বর, ২০২৫

ফুলের মতো মন – ক্ষুদীরাম দাস

ছোটগল্প

ফুলের মতো মন

ক্ষুদীরাম দাস

রাহুলের সাথে রিমির বিয়ে হয়েছিলো আট বছর আগে। বিয়ের দিন রাহুল রিমির হাতে একটা লাল গোলাপ ধরিয়ে দিয়েছিলো আর ফিসফিস করে বলেছিলো, “তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ফুল। আমি তোমাকে কখনো ভাঙবো না।” রিমি হেসেছিলো। সেই হাসিটা এখনো রাহুলের চোখে ভাসেÑযেন সারা পৃথিবী হেসে উঠেছিলো সেদিন।

প্রথম দু’টি বছর সত্যিই স্বপ্নের মতো কেটেছিলো। রাহুল তখনো ছোটো কোম্পানিতে চাকরি করতো। বাড়ি ফিরে রিমির হাতে একটা চকলেট বা একটা ছোটো ফুল নিয়ে আসতো। রিমি রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এসে তার গলা জড়িয়ে ধরতো। রাতে দু’জনে ছাদে বসে তারা দেখতো। রিমি বলতো, “জানো, আমার মনে হয় এই তারাগুলো আমাদের জন্যে জ্বলছে।” রাহুল তার কপালে চুমু খেয়ে বলতো, “তুমি আমার তারা।”

তারপর রাহুলের চাকরি বদলালো। বড়ো কোম্পানি, বড়ো পদ, বড়ো বেতন। সঙ্গে এলো বড়ো চাপ। অফিস থেকে ফিরতে রাত দশটা-এগারোটা। ফিরে এসে খেতে বসে মুখ ভোঁতা। রিমি যতোই যত্ন করে রান্না করুক, রাহুলের মুখে একটা “ঠিক আছে” ছাড়া আর কিছু উঠতো না। কথা বলতে গেলে বলতো, “আমি ক্লান্ত, পরে কথা হবে।” পরে কথা আর হতো না।

প্রথমে রিমি ভেবেছিলো এটা কয়েকদিনের। তারপর মাস পেরিয়ে গেলো। রিমি তখনো হাসি মুখে অপেক্ষা করতো। কিন্তু একদিন রাহুল ফিরে এসে দেখলো রিমি টেবিলে খাবার দিয়ে বসে আছে। ঘড়িতে রাত এগারোটা। রাহুল চেঁচিয়ে উঠলো, “এতো রাত পর্যন্ত খাবার গরম করে রাখো কেন? আমি তো বলেছি আমি খেয়ে নেবো!” রিমি চুপ করে বললো, “তুমি বলেছিলে আজ একটু তাড়াতাড়ি আসবে।” রাহুল প্লেটটা ঠেলে সরিয়ে দিলো। “তোমার এই বোকা বোকা কথা আমি আর শুনতে পারছি না।”
সেই রাতে রিমি প্রথম ডায়নিং টেবিলে মাথা রেখে কাঁদলো। কিন্তু কাউকে কিছু বললো না। মা ফোন করলে বলতো, “সব ঠিক আছে মা।”

এক বছর পর তাদের ছেলে হলোÑঅর্ণব। রিমি ভেবেছিলো এবার হয়তো সব বদলে যাবে। রাহুলও প্রথমে খুশি হয়েছিলো। কিন্তু অর্ণব যখন রাতে কাঁদতো, রাহুল বিরক্ত হয়ে বলতো, “ওকে চুপ করাও। আমার ঘুম হচ্ছে না।” রিমি রাতের পর রাত ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘুরতো। চোখের নিচে কালি পড়ে গিয়েছিলো। রাহুল দেখতো না।

একদিন রিমির জন্মদিন। রিমি সারাদিন অপেক্ষা করেছিলো। রাত দশটায় রাহুল ফিরলো। হাত খালি। রিমি হাসি মুখে বললো, “আজ আমার জন্মদিন ছিলো জানো?” রাহুল ভ্রƒ কুঁচকে বললো, “আরে হ্যাঁ, ভুলে গিয়েছিলাম। কাল কিছু কিনে দেবো।” রিমি আর কিছু বললো না। রাতে শুয়ে শুয়ে কাঁদলো।

এভাবেই দিন যেতে লাগলো। রিমির হাসি কমে গেলো। কথা কমে গেলো। সে চুপচাপ সংসার করতো। রান্না করতো। ছেলেকে মানুষ করতো। রাহুলের বন্ধু-বান্ধব এলে হাসি মুখে খাতির করতো। কিন্তু রাহুলের সঙ্গে আর আগের মতো কথা বলতো না। রাহুল বুঝতে পারেনি। বরং বলতো, “দেখো, বিয়ে হওয়ার পর মেয়েরা এমনই হয়।” তারপর এলো সেই দিনটা।

রাহুলের অফিসে প্রমোশন হলো। বড়ো পার্টি। বাড়িতে অনেক লোক এলো। রিমি সারাদিন রান্না করলো। সাজগোজ করলো। সবাই প্রশংসা করলো। রাতে সবাই চলে গেলো। রাহুল মদ্যপ অবস্থায় রিমিকে ডেকে বললো, “তুমি আজকে খুব সুন্দর লাগছিলে। কিন্তু জানো, আমার বসের বউ অনেক স্মার্ট। তুমি একটু ওরকম হতে পারো না?” রিমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে বললো, “আমি তো সেই রিমি, যাকে তুমি একদিন ফুল বলেছিলে।”

রাহুল হাসলো। “আহা, তুমি সবকিছু মনে রাখো। ওসব কলেজের প্রেম। এখন তো বাস্তব জীবন।”
সেই রাতে রিমি আর ঘুমালো না। সে ছাদে গিয়ে বসলো। যেখানে একদিন তারা দু’জনে তারা দেখতো। চোখের জল ফেলতে ফেলতে ভাবলোÑআমি কি সত্যিই বদলে গেছি? নাকি আমাকে বদলে দেওয়া হয়েছে?
পরদিন সকালে রাহুল ঘুম থেকে উঠে দেখলো ব্রেকফাস্ট টেবিলে শুধু একটা চিঠি।
“রাহুল,
আমি চলে যাচ্ছি। অর্ণবকে নিয়ে মায়ের কাছে।
তুমি একদিন বলেছিলে আমি তোমার ফুল।
কিন্তু ফুলকে যত্ন না করলে সে শুকিয়ে যায়।
আমি শুকিয়ে গেছি।
তোমাকে আর দোষ দিচ্ছি না।

শুধু একটা কথাÑযদি কখনো আবার কারো জীবনে আসো, তাকে ফুলের মতো যত্ন কোরো।
নইলে সে ভেঙে যাবে। আর সেই ভাঙা ফুলের দায় তোমারই থাকবে।
Ñরিমি”
রাহুল চিঠি পড়ে হতভম্ব হয়ে বসে রইলো। বাড়িটা ফাঁকা লাগছিলো। অর্ণবের খেলনা ছড়িয়ে আছে। রিমির আলনায় তার শাড়ি ঝুলছে। রান্নাঘরে তার হাতের গন্ধ এখনো লেগে আছে। রাহুল প্রথমবার বুঝলোÑসে কী হারিয়েছে।
সে দৌড়ে গেলো শ্বশুরবাড়ি। রিমির মা দরজা খুললেন। রাহুল কাঁদতে কাঁদতে বললো, “মা, আমি ভুল করেছি। আমাকে একটা সুযোগ দিন।” রিমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। চোখ লাল। কিন্তু মুখ শান্ত। সে বললো, “রাহুল, আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম বলেই এতোদিন সহ্য করেছি। কিন্তু এখন আর পারছি না। আমার ছেলের সামনে আমি ভাঙতে চাই না।”
রাহুল মাটিতে বসে পড়লো। “রিমি, আমি বুঝতে পারিনি। আমি নিজেকে বদলে ফেলেছিলাম। কিন্তু তুমি না থাকলে আমি কিছুই না। প্লিজ, ফিরে এসো। আমি প্রমাণ করবো।”
রিমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে বললো, “একটা শর্তে ফিরবো। তুমি যদি আমাকে আবার সেই রিমি বানাতে পারোÑযে হাসতো, যে গান গাইতো, যে তোমার জন্যে অপেক্ষা করতো। তাহলে ফিরবো। কিন্তু এবার আর ভুল করলে আমি চিরকালের জন্যে চলে যাবো।”
রাহুল মাথা নেড়ে সম্মতি দিলো।

তারপর থেকে রাহুল বদলে গেলো। অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরতো। রিমির হাতে ফুল আনতো। রাতে অর্ণবকে গল্প পড়তো। রিমির সঙ্গে ছাদে বসে তারা দেখতো। একদিন রিমির হাত ধরে বললো, “জানো, আমি ভেবেছিলাম তুমি বদলে গেছো। কিন্তু আসলে আমিই তোমাকে বদলে দিয়েছিলাম। তুমি ফুল ছিলে। আমি তোমাকে জল দিতে ভুলে গিয়েছিলাম।”
রিমি হাসলো। সেই পুরোনো হাসি। সে বললো, “ফুল আবার ফুটতে পারে। যদি যত্ন পায়।”
আজ আট বছর পরেও তারা ছাদে বসে। অর্ণব এখন বড়ো হয়েছে। সে জিজ্ঞেস করে, “মা, তুমি বাবাকে এতো ভালোবাসো কেন?” রিমি রাহুলের দিকে তাকিয়ে হাসে, “কারণ বাবা আমাকে আবার ফুল বানিয়েছে।”
আর রাহুল রিমির হাত শক্ত করে ধরে। মনে মনে বলেÑএই হাত আর কখনো ছাড়বো না।

 

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর