
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌমত্বের ডাকে পূর্ব বাংলার আপামর জনতা পশ্চিম পাকিস্তানীদের অত্যাচারে তুমুলভাবে জেগে ওঠে। ১৯৪৭-১৯৫২, ১৯৫২-১৯৭১ সাল, স্বাধীন বাংলার চূড়ান্ত বীজ বপন। পশ্চিম পাকিস্তানীদের অসনীয় শোষণ নির্যাতন, উৎপীড়নে বাংলার জনতা ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক নিরীহ জনতার ওপর আকস্মিক আক্রমণ যা ইতিহাসে ” কালো রাত” নামে অভিহিত। গ্রামের অতি সাধাসিধে দুরন্ত যুবক । তার নাম কমল। ১৯৭১ সালে মাতৃভূমির ডাকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
হাতে অস্ত্র, মাথায় গামছা বেঁধে বীরদর্পে প্রাণপণ যুদ্ধ করছে। বাড়িতে মা বাবা আর ছোট বোন তুলিকে নিয়ে অভাবের সংসার। কোনোমতে সংসার চলে । পশ্চিম পাকিস্তানীদের অসহ্য অত্যাচার। গোলা গুলির বিকট শব্দ। পাকসেনাদের বুটের আওয়াজ প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিন কাটে। অন্যদিকে কমল যুদ্ধে গেছে। মায়ের চিন্তা ভয় খুবলে খুবলে খায়। বাবাকে খাবারের খোঁজে বাইরে যেতে হয়। জানি না বাড়ি ফিরে যেতে পারবো কিনা? আমার চিন্তায় মায়ের প্রতিদিন রক্ত শুকায়। মায়ের আদেশেই যুদ্ধে এসেছি। আমাদের বাঁচতে হবে। বাঁচা মরার লড়াই । দেশ রক্ষা করতে হবে। প্রয়োজনে জীবন দিবো। তবু মাথা নোয়াবো
না। আমাদের মাতৃভূমি বাঁচাতে হবে। দেশ স্বাধীন করতে হবে। তবেই মুক্তি মিলবে। কমলের চোখে মুখে আগুনে আগুন। কমল প্রতিবাদী মুখর।আর কমল মনে মনে ভাবলো গ্রামের সকলকে নিয়ে যোদ্ধা বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। বিভিন্ন কৌশল, বুদ্ধিতে পশ্চিম পাকিস্তানীদের পরাজিত করতে হবে। যেই ভাবা সেই কাজ । কমলের চিন্তা চেতনা গ্রামের সকলকে অথ্যাৎ যুবকদের নিয়ে একটি বাহিনী গড়ে তোলেন নাম মুক্তিযোদ্ধা ।
দেশের জন্য যেই যুদ্ধ করবে সেই যোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা। কমলের কথা শুনে সবাই খুশি ও প্রতিবাদ মুখর হতে লাগলো এবং যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লো। ক্রমেই যুদ্ধ বাড়ছে। পাকসেনাদের বোমা গুলি বর্ষণ চলছে তো চলছেই। অত্যাচারের মাত্রা অসহনীয়। পূর্ব বাংলার ওপর যতই অত্যাচার বাড়ে মানুষ ততই প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। কমলের দৃঢ় প্রতিজ্ঞা যুদ্ধ সে করবেই। দেশ বাঁচাতে হবে। দেশ স্বাধীন করতে হবে। তবেই মুক্তি মিলবে। এদিকে বেশকিছু দিন কেটে গেছে। কমলের কোনো খোঁজ নেই। কমলের মা কমলের বাবাকে বলছে ” ওগো শুনছ,কমলের কোনো খোঁজ পেলে? বোন তুলিও বললো, ভাইয়া কখন বাড়ি আসবে? কমলের মা বলল, তোর ভাইয়া যুদ্ধে গেছে। যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরবে। এভাবে কয়েক সপ্তাহ কেটে গেল। চতুর্দিকে তুমুল যুদ্ধ ।
কমল তার দলবল নিয়ে যুদ্ধ করছে। ক্ষণে ক্ষণে পাশ দিয়ে গুলিবর্ষণ। মাঝে মধ্যে হাত বোমা ও গোলার বিকট শব্দ। হঠাৎ পাশ থেকে কান্নার আওয়াজ গ্রামের রহিম কাকা আর নেই। গোলার আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন দেহ । সামনে এগিয়ে আসছে পাকসেনা। আমরা অন অফ পজিশনে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর আসছে আমরা স্বাধীন হচ্ছি। সুদৃঢ় প্রত্যয়ে কৌশলে এগোতে থাকলাম। সামনে পাকসেনা ৫-৬ জন। সংখ্যায় আমরা ৪ জন ।
কমলের বুদ্ধিদীপ্ত গেরিলা নিয়মে পাকসেনাদের একে একে গুলি, যে কয়েক জন ছিল সবাই শেষ । অস্ত্র হাতে বাঁধ ভাঙা উল্লাস। কে শোনে কার কথা। এলাকায় শোরগোল । এলাকা শত্রু মুক্ত । আমরা স্বাধীন হচ্ছি। রেডিওতে ভেসে ভেসে খবর এলো পূর্ব বাংলা আজ থেকে স্বাধীন। পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। কমল আকাশের দিকে হাত উঁচিয়ে, মাথা উঁচিয়ে চিৎকার করে বলছে মা তুমি শুনছো আমরা স্বাধীন হয়েছি। আমরা স্বাধীন। যুদ্ধ করে আমরা সোনার দেশ পেলাম। আজ থেকে আমরা মুক্তাকাশে উড়বো।
মো. আব্দুল আলিম
কবি ও সাহিত্যিক
আপনার মতামত লিখুন :