
মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার :
এক টুকরো ছাদের নিরাপত্তা হারানোর ভয় এই একটাই দুশ্চিন্তা যেন কেড়ে নিল ৭০ বছরের আফিয়া বেগমের জীবন। সোনাইমুড়ী উপজেলার জয়াগ বাজার এলাকায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে উচ্ছেদের হুমকির পর আতঙ্কিত হয়ে তার মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি স্থানীয় জনমনে গভীর শোক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
নিহত আফিয়া বেগম শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বেলাল হোসেনের মা। পরিবারের ভাষ্য, বহু বছরের বসতভিটা ও একমাত্র আয়ের উৎস হারানোর শঙ্কাই মায়ের মৃত্যু ত্বরান্বিত করেছে। অভিযোগ রয়েছে, ‘এসো গড়ি উন্নয়ন সংস্থা’র পরিচালক আবদুল আউয়াল গত সোমবার (১৩ এপ্রিল) লোকজন নিয়ে এসে তাদের দোকান ও বসতঘর পাঁচ দিনের মধ্যে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। অন্যথায় উচ্ছেদের হুমকি দেন বলেও দাবি পরিবারের। এর পর থেকেই চরম মানসিক চাপে পড়েন আফিয়া বেগম। রাতভর অস্থিরতায় কাটিয়ে পরদিন সকালে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
কান্নাভেজা কণ্ঠে ছেলে বেলাল হোসেন বলেন,এই ঘর আর দোকানই আমাদের সব। মা বারবার বলত আমরা কোথায় যাব? সেই ভয়ই ওনাকে শেষ করে দিল। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, বেলালের বাবা মৃত আলী আশরাফ খান সওজের জমি ইজারা নিয়ে দীর্ঘদিন সেখানে বসবাস ও ব্যবসা পরিচালনা করতেন। তার মৃত্যুর পর প্রতিবন্ধী ছেলে বেলালই সেই দায়িত্ব বহন করে আসছেন। তবে ইজারার মেয়াদ শেষ হলে নবায়ন বন্ধ রয়েছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
এদিকে ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর আবদুল আউয়াল একই এলাকার একটি অংশ ইজারা নেন প্রবেশপথ নির্মাণের জন্য। অভিযোগ উঠেছে, নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে তিনি বেলালের দোকান উচ্ছেদের চেষ্টা করছেন।
স্থানীয়দের মতে, জমিটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাবশালীদের আগ্রহ ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে উচ্ছেদের চাপ বাড়তে থাকায় অসহায় পরিবারটি অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়।
জয়াগ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মহিন উদ্দিন বলেন, প্রতিবন্ধী বেলাল ও তার পরিবার বহুদিন ধরে সেখানে বসবাস করছে। নতুন করে ইজারা দেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে আবদুল আউয়াল বলেন, তিনি কোনো হুমকি দেননি। সওজের কাজের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই সরে যেতে বলেছেন বলে দাবি করেন তিনি। এছাড়া আফিয়া বেগম পূর্ব থেকেই অসুস্থ ছিলেন বলেও উল্লেখ করেন। ক্যান্সার আক্রান্ত তিনি মারা যান। তবে পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা এই দাবি নাকচ করে জানান, আফিয়া বেগম ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন না; তিনি শুধু ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন।
এ বিষয়ে সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফরিদ উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
একদিকে জীবিকার অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে আশ্রয় হারানোর ভয় এই দ্বৈত চাপে এক বৃদ্ধার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত থেকে যায় এক বেদনাবিধুর প্রশ্ন একটি অসহায় পরিবারের শেষ আশ্রয়টুকুও কি রক্ষা পাবে না?
আপনার মতামত লিখুন :