
আবুল চাচা গরীব মানুষ। পরের বাড়ি জন খেটে সংসার চালান। একটা ছেলে ছিল, করোনা কালে মারা গিয়েছে। ছেলেটা জীবিত থাকলে ভালো হতো।সংসার নিয়ে চিন্তা করতে হতো না।
চাচার বয়স পঞ্চান্ন-ষাটের মাঝামাঝি, কিন্তু চেহারা দেখে মনে হয় হাওয়া লাগলে উড়ে যাবেন। হাড়গোড় এমন স্পষ্ট যে গ্রামের ছেলেপেলে মাঝে মাঝে তাকে এক্স-রে চাচা বলে ডাকে। কাজের বাজারে তার কদর ঠিক পাকা আমের মৌসুম শেষের দামের মতো কেউ না পেলে তবেই ডাক পড়ে। সপ্তাহে দুই-তিন দিন কাজ জোটে, বাকিটা সময় তিনি ভাবেন, আজ কিভাবে সংসার চলবে? মহা দুঃশ্চিতায় থাকেন। এই চাচার গরুর গোশত খাওয়ার খুব ইচ্ছে হলো। ইচ্ছা হলেই তো আর খাওয়া যাবে না। টাকা লাগবে। টাকা কই পাবে। ইচ্ছা তাই বন্ধ করে রাখতে হয় মনের ভিতর তালা দিয়ে।
সংসারে স্ত্রী, এক মেয়ে আর তিনি। ছেলেটা থাকলে এত ভাবনা থাকত না। ছেলেটা রোজগার করত, বাড়িতে মাঝে মাঝে গোশও ঢুকত। এখন গোশ ঢোকে শুধু ঈদের দিনে, তাও চাচার ভাগ্যে জোটে না। গত ঈদে যে ক’টুকরো এসেছিল, তা এমন গতিতে গায়েব হলো যে চাচা শুধু হাঁ করে হাঁড়ির ঢাকনা দেখেছেন।
গরুর মাংসের প্রতি তার ভালোবাসা এখন প্রায় দার্শনিক পর্যায়ে। একদিন মোল্যা বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে বিপদ হলো। রান্নাঘর থেকে এমন সুবাস এলো যে চাচার নাক নিজে থেকেই দরজার ফাঁকে ঢুকে যেতে চাইল। তিনি কাজ শেষ করে ইচ্ছে করে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত করলেন। মনে মনে ভাবলেন, এইবার নিশ্চয় বলবে, আবুল ভাই, খেয়ে যান। কিন্তু কেউ বলল না। উল্টো একজন জিজ্ঞেস করল, চাচা, এখনো যান নাই?
চাচা লজ্জায় বললেন, হ, যাচ্ছি। চাচা বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন।
এরপর থেকে বেলেশ্বর বাজার তার তীর্থস্থান। গরু জবাই হলেই তিনি হাজির। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাংস মাপা দেখেন। কখনো মনে হয়, যদি দৃষ্টিশক্তি দিয়ে একটু কেটে নেওয়া যেত!
সেদিন আর মন মানল না। কসাই ব্যস্ত, ক্রেতারা দরদাম করছে। চাচার চোখে তখন শুধু দুই টুকরো লাল-চকচকে মাংস। হাত বাড়ালেন, টুপ করে তুলে নিলেন, আর ধীর পায়ে হাঁটা দিলেন।
কিন্তু পাশের লোকের চোখ ছিল ঈগলের মতো। গোশ নিয়ে গেল! গোশ নিয়ে গেলো, বলে চিৎকার করতে লাগলো । কসাই দৌড়ে এসে চাচাকে ধরল। দু-চারটা কিল-ঘুষি, তারপর দোকানের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হলো।
চাচা চুপ। তার চোখে পানি নেই, শুধু গোশত খাওয়ার ইচ্ছে। গোশ বিক্রি শেষ হলে কসাই জিজ্ঞেস করল, চাচা, চুরি করলেন কেন?
চাচা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ভাইরে, চুরি করি নাই…
গোশের লোভ সামলাতে পারি নাই। বহু বছর গরুর গোশ খাইনা তো….
বাজার থমথমে। কসাই একটু চুপ করে থেকে হঠাৎ বলল, এই নেন, আরও দুই টুকরো। তবে পরেরবার চুরি না করে, বলবেন।
বাঁধন খুলে দিলো। চাচা কাঁপা হাতে গোশ নিলেন। বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে বারবার পলিথিনের ভেতর তাকান,যেন ভয়, স্বপ্নটা আবার উড়ে না যায়।মনে মনে ভাবেন, কিল-ঘুষি দিক আর বেঁধে রাখুক গোশ তো দিয়েছে! মজা করে খাওয়া যাবে। আবুল চাচা মনে মনে হাসেন।
সেদিন রাতে তাদের ঘরে উৎসব হলো। চাচা প্রথম লোকমা মুখে দিয়ে চোখ বন্ধ করে বললেন, আহা! জীবনের স্বাদ এইটাই! এর চেয়ে মজার কিছু আছে ভাবাই যায় না।
আপনার মতামত লিখুন :