
সাব্বির ইবনে ছিদ্দিক, হাতিয়া :
মেঘনার মোহনায় অবস্থিত দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া শুধু মাছ, চিংড়ি আর কাঁকড়ার জন্যই পরিচিত নয়; এর প্রকৃত সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য ও বৈচিত্র্যময় পর্যটন স্পট এখন দেশের পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। প্রাকৃতিক বনভূমি, বিস্তীর্ণ বালুকাবেলা, নীল জলরাশি ও নির্জন সৈকতের অপার মেলবন্ধনে হাতিয়া হয়ে উঠেছে মেঘনার বুকে লুকানো এক স্বর্গরাজ্য।
হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপকে অনায়াসেই ‘বাংলাদেশের গোপন স্বর্গ’ বলা যায়। সবুজ কেওড়া বন, হরিণের বিচরণ, পাখির কোলাহল আর সাদা বালির সৈকত নিঝুম দ্বীপকে দিয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য।
জোয়ার-ভাটার খেলায় রূপ বদলানো এই দ্বীপে সমুদ্রস্নান, নৌবিহার, পাখি পর্যবেক্ষণ ও সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা পর্যটকদের মুগ্ধ করে। পর্যাপ্ত কটেজ, নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠলে নিঝুম দ্বীপ আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে।
বুড়িরচর ইউনিয়নের ঐতিহাসিক কমলার দিঘি প্রেম, বেদনা ও জনশ্রুতির সাক্ষী। কথিত আছে, প্রিয় কন্যা কমলার স্মরণে এক জমিদার এই দিঘি খনন করেন। চারপাশে প্রাচীন বৃক্ষরাজি, দিঘির জলে আকাশের প্রতিচ্ছবি আর পাখির কলরব—সব মিলিয়ে এখানে তৈরি হয়েছে এক আবেগঘন পরিবেশ। সংরক্ষণ ও নান্দনিক উন্নয়ন করা গেলে এটি হাতিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।
রহমত বাজার সি বীচ ও নিমতলী সি বীচের বিস্তীর্ণ বালুচর, জোয়ারের ঢেউ আর সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করে। জেলেদের নৌকা, মাছ ধরার দৃশ্য ও নীল জলরাশির সাথে গ্রামবাংলার জীবনযাত্রা এখানে ভিন্ন এক আবেশ তৈরি করেছে। পর্যটন অবকাঠামো ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এ সৈকতগুলো দেশের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হতে পারে।
বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে জেগে ওঠা এম আলী লালচর কেওড়া ও গোলপাতার বন, সবুজ ঘাস আর সাগরের ঢেউয়ে এক অনন্য দৃশ্যপট তৈরি করেছে। অপরদিকে সোনাদিয়া সি বীচ লাল কাঁকড়ার বিচরণ, ঝাউবাগান ও মনোমুগ্ধকর সূর্যাস্তের জন্য ইতোমধ্যেই পরিচিতি পেয়েছে। উন্নত যোগাযোগ ও পরিকল্পিত বিনিয়োগ হলে সোনাদিয়া সি বীচ কক্সবাজারের বিকল্প পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নলচিরা ঘাট, জামতলী সৈকত ও হরণী রিজার্ভ বন নলচিরা ঘাট হাতিয়ার প্রাণকেন্দ্র। এখানে দাঁড়িয়ে মেঘনার উত্তাল ঢেউ ও সূর্যাস্তের লাল আভা উপভোগ করেন স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকরা। হরণী ইউনিয়নের জামতলী সৈকত ও পাশের হরণী রিজার্ভ বন—যাকে ‘ছোট সুন্দরবন’ বলা হয়—পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। নৌকায় বনভ্রমণ, কেওড়া-গেওয়া বন ও বন্যপ্রাণী দর্শন এখানে অন্যতম আকর্ষণ।
হাতিয়া দ্বীপ কলেজের অধ্যাপক ও উপাধ্যাপক তোফায়েল হোসেন বলেন, “সরকারিভাবে পর্যটন সুবিধা, নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে হাতিয়াকে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন অঞ্চলে রূপান্তর করা সম্ভব।”
ফজলুল আজিম আদর্শ মহিলা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক মো. মহিববুর রহমান বলেন,
“হাতিয়ার পর্যটন উন্নয়ন শুধু সৌন্দর্য নয়, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পরিকল্পিত বিনিয়োগ হলে এই দ্বীপ টেকসই পর্যটনের একটি আদর্শ মডেল হতে পারে।”
মেঘনার বুকে লুকানো হাতিয়া তার অফুরন্ত সৌন্দর্য নিয়ে অপেক্ষায় আছে। সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো উন্নয়নই পারে এই দ্বীপকে বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে এক নতুন স্বর্গরাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে।
আপনার মতামত লিখুন :