
সাব্বির ইবনে ছিদ্দিক, হাতিয়া :
বহু বছরের বঞ্চনা, অপেক্ষা ও আন্দোলনের পর অবশেষে স্বপ্নের ফেরি পেল জেলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া। তবে ফেরি উদ্বোধনের আনন্দঘন দিনেই রাজনৈতিক সংঘর্ষে রক্তাক্ত হয়ে উঠল পুরো এলাকা।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বিকেলে হাতিয়ার নলচিরা–চেয়ারম্যান ঘাট নৌপথে ফেরি সার্ভিসের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বিএনপি ও এনসিপি নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
সংঘর্ষের সময় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হাজারো মানুষ আতঙ্কে দিকবিদিক ছোটাছুটি করতে থাকেন। মুহূর্তেই উৎসবের পরিবেশ ভেঙে পড়ে ভীতিকর পরিস্থিতিতে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম জানান, “পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ঘটনার বিষয়ে তদন্ত চলছে।” এর আগে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নুরুন্নাহার চৌধুরী আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ফেরি মহানন্দা’ সার্ভিসের উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান, চিফ ইঞ্জিনিয়ার, বিআইডব্লিউটিসির কমার্শিয়াল ডিরেক্টরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও হাতিয়া দ্বীপ সমিতির প্রতিনিধি দল, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও প্রায় দুই হাজারের বেশি মানুষ অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
স্থানীয়দের মতে, ফেরি সার্ভিসটি নিয়মিত চালু হলে হাতিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। বাস, মিনিবাস, প্রাইভেটকার, লরি ও মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে নিরাপদ যাতায়াতের পাশাপাশি দ্বীপের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে। স্থানীয় বাসিন্দা নাহিদ বলেন, “ফেরির জন্য আমরা বহু বছর ধরে অপেক্ষা করেছি। আজ সেটা বাস্তব হলো। নিয়মিত চললে এটা আমাদের জন্য আশীর্বাদ হবে।”
একজন মোটরসাইকেল চালক বলেন, “জীবনে প্রথমবার হোন্ডাসহ ফেরিতে পার হলাম। এটা স্বপ্নের মতো। যারা এই উদ্যোগ নিয়েছেন, আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।”
হাতিয়া দ্বীপ সমিতির সভাপতি ডা. জাহেদুল আলম বলেন, “এই ফেরি হাতিয়ার ইতিহাসে একটি মাইলফলক। তবে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়লে এই অর্জন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। উন্নয়নের স্বার্থে সবার ঐক্য দরকার।” ফেরির চালক মাস্টার মোজাম্মেল হক জানান, ফেরিটি জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলবে। ফেরিটির ধারণক্ষমতা প্রায় ২৫০ টন এবং নিরাপদ পরিচালনায় স্থানীয়দের সহযোগিতা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙন, যোগাযোগ সংকট ও নাগরিক সুবিধার অভাবে পিছিয়ে থাকা হাতিয়াবাসীর বহুদিনের দাবির ফল এই ফেরি সার্ভিস। ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি ঢাকাস্থ হাতিয়া দ্বীপ সমিতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে ফেরি ও সিট্রাক চালুর আবেদন জানায়। পরে ১২ মার্চ তৎকালীন জেলা প্রশাসক উপকূলীয় নদীবন্দর স্থাপনের সুপারিশ করেন। স্বপ্ন পূরণের এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত যেন রাজনৈতিক সংঘর্ষে ম্লান না হয়—এটাই এখন হাতিয়াবাসীর একমাত্র প্রত্যাশা।
আপনার মতামত লিখুন :