
মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার :
নোয়াখালী-কুমিল্লা মহাসড়কের সোনাইমুড়ীর চৌরাস্তা জোড় পোলে সংযুক্ত হয়েছে চারটি খাল। সেই সংযোগের মুখে বাঁধ দিয়ে চলছে ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্রিজ নির্মাণ। জেলা পরিষদ থেকে অস্থায়ী ভাবে চলাচলের অনুমতি নিয়ে স্থায়ী ভাবে তৈরী হচ্ছে ব্রিজ। মহাসড়কের কোল ঘেঁষে, গাইড পোস্ট ভেঙ্গে খালের ভেতরে এমন স্থাপনা একদিকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির আশঙ্কা বাড়াচ্ছে অন্যদিকে মাটি ধসে মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরী হচ্ছে। এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে চারটি খালের মুখে বাঁধ দিয়ে ব্রিজ নির্মাণের প্রচেষ্টা করলে তা বন্ধ করে দেয় তৎকালীন এসিল্যান্ড দ্বীন আল জান্নাত। নির্মাণসামগ্রী জব্দ করে সড়ক ও জনপদ বিভাগ। তবে তিনি বদলি হওয়ার পরদিন থেকে আবার শুরু হয়েছে ব্রিজের কাজ।
জেলা পরিষদের গোপনীয় সহকারী মোঃ নুর উদ্দিন জানান, তিনি নিজে এই ব্রিজ নির্মাণের জন্য আবেদনের কাগজপত্র জেলা পরিষদের প্রশাসকের কাছে উপস্থাপন করেছেন। ব্রিজের কোন নকশা তারা আবেদনের সাথে জমা দেয়নি। আর অস্থায়ী ভাবে ব্রিজ নির্মাণের জন্য প্রকৌশলী থেকে কোন নকশার প্রয়োজন হয়না। তিনি নিশ্চিত করেন- সিসি ঢালাই বা পাকা স্থাপনা নয়, বাঁশ-কাঠ বা গ্রাম্য সাকোর মত অস্থায়ী ভাবে চলাচলের ব্রিজ নির্মাণের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
জেলা পরিষদ আইন, ২০০০-এর ৪৮ নম্বর ধারায় অস্থায়ী স্থাপনার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে- অস্থায়ী স্থাপনা বলতে সহজে অপসারণযোগ্য উপাদান ব্যবহার করা। অস্থায়ী স্থাপনাটি এমন সামগ্রী (যেমন- বাঁশ, কাঠ, টিন, বা লোহার অস্থায়ী ফ্রেম) দিয়ে তৈরি হতে হবে, যা স্বল্প সময়ের নোটিশে সম্পূর্ণ অপসারণ করা সম্ভব।
জেলা পরিষদ সূত্র জানায়, ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার তদবিরে ব্রিজ নির্মাণের অনুমতি দিয়েছেন জেলা পরিষদের প্রশাসক হারুনুর রশিদ আজাদ। এবিষয়ে কথা বলতে জেলা পরিষদে গিয়ে জানা যায়, জেলা পরিষদের প্রশাসক চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে রয়েছেন। পরে কথা হয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহীর সাথে। সেখানে সার্ভেয়ার ইমরান হোসেন এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ন রশিদের কথপোকথনে রাজনৈতিক নেতার তদবিরের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়।
প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে প্রধান নির্বাহীর সাথে কথা হলে তিনি সার্ভেয়ার ইমরানকে প্রশাসক দেশে ফেরার আগ পর্যন্ত সাময়িক ব্রিজের ভাবে কাজ বন্ধ রাখার জন্য নির্মাণকারীদের মুঠোফোনে জানাতে বলেন। এসময় ইমরান প্রধান নির্বাহীকে স্বরণ করিয়ে দেন ‘কাজটা বিএনপি নেতা তদবির হচ্ছে।’ ইমরান বলেন- জয়াগ ইউনিয়ন থেকে বিএনপির একটা ছেলে এসেছিলো আপনার কাছে। ঢাকা ইউনিভার্সিটির সোহেল। সেইতো এসেছিলো চেয়ারম্যানের কাছে এটা নিয়ে। আপনি বলেছিলেন “এটা আমার পক্ষে সম্ভব না, আপনি চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলেন।” তার পরেই তো চেয়ারম্যান বললেন জমিটা মাপ দিতে।
অনুমতির বিষয়ে প্রধান নির্বাহী বলেন- “পানি চলাচলে বাঁধা হবে এমন কিছু অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ নেই। জেলা পরিষদ অস্থায়ী অনুমোদন বেশি দেয়। স্থায়ী কোন কিছু নির্মাণের অনুমতি সাধারণত আমরা দিতে চাইনা বা দেওয়াটা আমাদের জন্য সমিচিন নয়।”
সওজ বিভাগ জানায়, সরু ব্রিজ বা কালভার্টের শুরুতে গাইড পোস্ট স্থাপন করা হয় যাতে চালক গাড়ি নামানোর সময় বা পার হওয়ার সময় সড়ক থেকে নিচে পড়ে না যান। সোনাইমুড়ী জোড়পোল এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, নোয়াখালী-কুমিল্লা মহাসড়কের গাইড পোস্ট ভেঙ্গে চলছে ব্রিজ নির্মাণের কাজ।
এছাড়া ১৯২৫ সালের দ্য হাইওয়েজ অ্যাক্ট (Highways Act, 1925) এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ভূমি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০১৫ বলছে, সওজের অধিগ্রহণকৃত সকল জমির চূড়ান্ত মালিক সরকার এবং এর রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহারের একমাত্র কর্তৃত্ব সওজ-এর। সওজের অধিগ্রহণ করা জমিতে কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি বা লাইসেন্স ছাড়া যেকোনো স্থাপনা বা ব্রিজ নির্মাণ করাকে অবৈধ দখল ও আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। যদি কেউ নিজের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে যাওয়ার জন্য সওজের জমির ওপর দিয়ে সংযোগ ব্রিজ বা প্রবেশপথ তৈরি করতে চান, তবে তাকে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ও ফি প্রদান করে সওজ থেকে ভূমি ব্যবহারের অনুমতি বা সাময়িক ইজারা নিতে হয়। তবে ব্রিজ নির্মাণকারীরা এই বিষয়ে কোন অনুমোদন নেয়নি নোয়াখালী সওজ থেকে।
এবিষয়ে নোয়াখালী সড়ক ও জনপদ বিভাগের সার্ভেয়ার জাহিদ হোসেন জানান, ১৯৯২ সালে সোনাইমুড়ী ছাতারপাইয়া জোড়পোলের নোয়াখালী-কুমিল্লা মহাসড়ক সংলগ্ন জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। জোড়পোলের যেখানে ব্রিজ নির্মাণের কাজ চলছে তার পাশে অবস্থিত খাবার হোটেল পর্যন্ত নোয়াখালী সওজ বিভাগ অধিগ্রহণ করেছে। তবে নামজারি না হওয়ায় ওই অংশটুকু এখনো জেলা পরিষদের নামে রয়েছে।
নোয়াখালী সড়ক ও জনপদ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জানান, গত বছর ওই স্থানে অবৈধ ভাবে ব্রিজ নির্মাণ করায় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এবারেও ব্রিজ নির্মাণকারীরা কোন অনুমতি নেয়নি। এছাড়া জোড়পোলের মত গুরুত্বপূর্ণ চার রাস্তার মোড়ের গাইড পোস্ট ভেঙ্গে ব্রিজ নির্মাণ অবৈধ। আগামীকাল সরেজমিনে পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
আপনার মতামত লিখুন :