• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৯শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৫ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১৮ মে, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ১৮ মে, ২০২৬

আদর্শ ও চরিত্রের অন্তর্গত সংকট – মোস্তফা ইকবাল

আদর্শ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শব্দগুলোর একটি। এই শব্দের ভেতরে মানুষের হাজার বছরের স্বপ্ন জমে আছে, ন্যায়বিচার, মানবতা, সততা, সাম্য, প্রেম, স্বাধীনতা। সবকিছুর কেন্দ্রেই কোনো না কোনো আদর্শ কাজ করে। মানুষ আদর্শের জন্য যুদ্ধ করেছে, কারাগারে গেছে, মৃত্যুবরণ করেছে; আবার মানুষই আদর্শের নামে প্রতারণা করেছে, রক্ত ঝরিয়েছে, সভ্যতাকে কলঙ্কিত করেছে। তাই প্রশ্ন জাগে আদর্শ কি ব্যর্থ? নাকি ব্যর্থ মানুষের চরিত্র?
আদর্শ আসলে কখনো একা ধ্বংস হয় না। তাকে ধ্বংস করে এক শ্রেণির মানুষ, যারা মুখে আদর্শ ধারণ করে, কিন্তু অন্তরে ধারণ করে না সততা। কারণ আদর্শ কেবল উচ্চারণের বিষয় নয়, আদর্শ মূলত চরিত্রের ভেতরে জন্ম নেওয়া এক নৈতিক শক্তি। চরিত্র যদি দুর্বল হয়, তবে মহৎ আদর্শও মানুষের হাতে এসে বিকৃত হয়ে যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে সুন্দর আদর্শের অভাব নেই, অভাব আছে সেই আদর্শ বহন করার মতো নির্মল মানুষের। বহু বিপ্লব শুরু হয়েছিল মানুষের মুক্তির কথা বলে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার অহংকারে সেই বিপ্লবই মানুষের কণ্ঠরোধ করেছে। বহু মানুষ ন্যায়বিচারের কথা বলেছে, অথচ নিজের স্বার্থের কাছে নতজানু হয়েছে।
বহু নেতা মানবতার ভাষণ দিয়েছেন, অথচ মানুষের কান্না শোনেননি। তখন বোঝা যায় আদর্শের সৌন্দর্য শুধু যথেষ্ট নয়, তার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন চরিত্রের সৌন্দর্য।
চরিত্রহীন মানুষের হাতে আদর্শ বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
কারণ সে আদর্শকে ব্যবহার করে নিজের ক্ষমতা, প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার জন্য। বাইরে থেকে তখন সবকিছু মহৎ মনে হয়, কিন্তু ভেতরে ভেতরে পচন শুরু হয়। ঠিক যেমন একটি সবুজ গাছ বাইরে থেকে সতেজ দেখালেও ভিতরে যদি উইপোকা বাসা বাঁধে, তবে একদিন সামান্য ঝড়েই তা ভেঙে পড়ে। আমাদের রাজনীতি এবং সমাজের সবচেয়ে বড় সংকট এখানেই, আমরা আদর্শের ভাষা শিখছি, কিন্তু চরিত্র গঠনের কঠিন সাধনা ভুলে যাচ্ছি। আমরা সত্যের কথা বলি, কিন্তু সত্য ধারণ করার সাহস রাখি না। আমরা ন্যায়ের কথা বলি, কিন্তু নিজের সুবিধার বিরুদ্ধে গেলে নীরব হয়ে যাই। আমরা মানবতার কথা বলি, কিন্তু মানুষের প্রতি সহমর্মিতা হারিয়ে ফেলি। ফলে আদর্শ ধীরে ধীরে শুধু স্লোগানে পরিণত হয়, আর চরিত্রহীনতা বাস্তবতার নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। একটি সুন্দর সমাজ কেবল আইন দিয়ে তৈরি হয় না; তা তৈরি হয় মানুষের ভেতরের নৈতিক শক্তি দিয়ে। কারণ আইন ভয় সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু চরিত্র সৃষ্টি করে বিবেক। আর বিবেকহীন মানুষের হাতে কোনো মহান দর্শনই নিরাপদ নয়। আসলে আদর্শ আকাশের মতো বিশাল, উজ্জ্বল এবং অনন্ত। কিন্তু চরিত্র হলো সেই মাটি, যেখানে আদর্শের বীজ রোপিত হয়। মাটি যদি উর্বর না হয়, তবে সবচেয়ে সুন্দর বীজ থেকেও কোনো মহৎ বৃক্ষ জন্মায় না। তাই আমাদের প্রয়োজন আদর্শকে ধারণ করার জন্যে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের চরিত্র গঠনের নৈতিক শিক্ষা গ্রহণের প্রশিক্ষণ। আদৌও কি আমাদের দেশের রাজনীতিতে সেই শিক্ষা, এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা চালু আছে?
বা কখনও চালু হবে?
কারণ আদর্শ মানুষকে পথ দেখায়, কিন্তু চরিত্র মানুষকে সেই পথে হাঁটার শক্তি দেয়। আদর্শ যত সুন্দর হোক, চরিত্র সুন্দর না হলে তা বাস্তবায়ন অসম্ভব।
চরিত্র শুধু ব্যক্তিগত আচরণের আয়না নয়, চরিত্র অনেক সময় একটি শ্রেণীর মানসিক অবয়বও নির্মাণ করে।
সমাজে এমন কিছু মানুষ কিংবা গোষ্ঠী জন্ম নেয়, যারা দীর্ঘদিন ক্ষমতা, অর্থ কিংবা প্রভাবের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করতে করতে নিজেদেরকে সাধারণ মানুষের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করে। তখন তাদের ভেতরে জন্ম নেয় এক অদৃশ্য অহংকার। সেই অহংকার ধীরে ধীরে বিবেককে গ্রাস করে ফেলে। মানুষ তখন আর মানুষ থাকে না, অবস্থানই হয়ে ওঠে তার পরিচয়। আমাদের সমাজে সেই পরিচয়ের পরিচিতরাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব রয়েছে বললে খুব একটা ভুল বলা হবে না।
আমরা অহরহ দেখতে পাই আমাদের সমাজে নেতিবাচক মানুষদের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়,
এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সেই নেতিবাচক লোকজনকে দলে বেড়ানোর অশুভ প্রতিযোগিতাও দেখা যায়। বিগত দিনে রাজনৈতিক দলগুলোর এই অচ্ছুৎ গ্রহণ আমরা দেখেছি এবং এখনও দেখতে হচ্ছে। এই বাস্তবতার খুব বেশি পরিবর্তন আজও দেখা যায় না। আমরা দেখছি সমাজের ঘুষ দুর্নীতিতে অভিযুক্ত, দখলদার, চাঁদাবাজ, কিংবা ভূমিদস্যু, সেরকম ব্যক্তিবর্গ রাজনীতির নানান স্তরে নেতৃত্বে এসেছে, এমনকি স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তাদেরকে দম্ভের সাথে নমিনেশন দেয়া হয়। এর প্রধান কারণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন গনতান্ত্রিক উপায়ে না হয়ে আবেগে আবৃত হয়ে ওঠে তখন রাজনীতি আর রাজনীতি থাকে না। রাজনীতি হয়ে ওঠে বাপদাদার সম্পদের মতো অহংকারের এক
বিধ্বংসী চরিত্র।
এই অহংকারের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো এটি নিজেকে কখনো অন্যায় মনে করে না। বরং নিজের ক্ষমতাকেই সত্য মনে করে। ফলে মানুষের কান্না তাদের কানে পৌঁছায় না।প্রতিবাদ তাদের কাছে শত্রুতার ভাষা মনে হয়, আর ভিন্নমতকে তারা অবজ্ঞার চোখে দেখে। তখন আদর্শ ধীরে ধীরে মানবিকতা হারায় এবং নৈতিকতার জায়গা দখল করে আত্মম্ভরিতা। ইতিহাসে বহু পতনের পেছনে এই শ্রেণীগত অহংকার নীরব বিষের মতো কাজ করেছে। বাইরে থেকে সভ্যতার প্রাসাদ যতই দীপ্ত দেখাক, ভেতরে যদি অহংকারের অন্ধকার জমে ওঠে, তবে সেই প্রাসাদ একদিন নিজের ভারেই ভেঙে পড়ে। কারণ অহংকার মানুষকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সে আর মানুষের চোখের ভাষা বুঝতে পারে না, শুধু নিজের প্রতিচ্ছবিকেই সত্য বলে বিশ্বাস করতে থাকে। তাই চরিত্রের প্রশ্নটি কেবল ব্যক্তিগত নৈতিকতার প্রশ্ন নয়; এটি সামাজিক এবং রাজনৈতিক অস্তিত্বেরও প্রশ্ন। একটি সমাজ তখনই সুস্থ থাকে, যখন ক্ষমতার ভেতরেও বিনয় বেঁচে থাকে, যখন আদর্শের ভেতরেও
আত্মসমালোচনার সাহস থাকে। অন্যথায় আদর্শ একসময় শুধুমাত্র সাইনবোর্ড আর স্লোগানে পরিণত হয়, আর অহংকার মানুষের ভেতরের মানবিক ভূগোলকে ধ্বংস করে দেয়। কারণ যে ব্যক্তি কিংবা যে রাজনৈতিক গোষ্ঠী নিজের ভুল স্বীকার করতে শেখে না, তার আদর্শ ধীরে ধীরে অন্ধ বিশ্বাসে পরিণত হয়। আত্মসমালোচনা আসলে চরিত্রের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। এটি মানুষকে নিজের ভেতরের অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড় করায়। কিন্তু ক্ষমতার পরিবেশ মানুষকে সাধারণত এই সাহস থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। সেখানে প্রশংসা থাকে, আনুগত্য থাকে, কিন্তু সত্য বলার মানুষ কমে যায়। ফলে ভুল ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হয় এবং একসময় সেই অভ্যাসই প্রতিষ্ঠান, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের ভেতরে নৈতিক অবক্ষয়ের ভিত্তি তৈরি করে।
একটি সুস্থ সমাজের সৌন্দর্য এখানেই যে, সেখানে প্রশ্ন করার অধিকার বেঁচে থাকে। ভিন্নমতকে শত্রু মনে করা হয় না; বরং তা সত্য অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ সত্য কখনো একক অহংকারের সম্পত্তি নয়। সত্যের পথে পৌঁছাতে হলে মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধতাও স্বীকার করতে হয়। যে আদর্শ আত্মসমালোচনাকে ভয় পায়, সে আদর্শ ধীরে ধীরে মানবিকতা হারিয়ে ফেলে।
আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় এই সংকট ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আমরা ব্যক্তিপূজার দিকে যত এগোচ্ছি, ততই নৈতিক প্রশ্নগুলো আড়ালে চলে যাচ্ছে।
গণতন্ত্রের মৌলিক সৌন্দর্য হলো এখানে ব্যক্তি নয়, নীতি এবং প্রতিষ্ঠান বড় হয়ে ওঠে। কারণ গণতন্ত্র কোনো একক মানুষের প্রজ্ঞার উপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এটি দাঁড়িয়ে থাকে পারস্পরিক জবাবদিহিতা, মতের বহুত্ব এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের উপর। কিন্তু যখন একটি সমাজ ধীরে ধীরে ব্যক্তিপূজার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন গণতন্ত্রের ভেতরের নৈতিক কাঠামো দুর্বল হতে শুরু করে। মানুষ তখন আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিকে বড় করে দেখতে শেখে। ফলে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি ক্ষীণ হয়ে যায়, আর সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে বিবেচনা করা শুরু হয়। ব্যক্তিপূজার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এটি মানুষকে ধীরে ধীরে চিন্তার স্বাধীনতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তখন একজন নেতার ভুলও অনুসারীদের কাছে সত্য বলে মনে হয়। যুক্তির জায়গা দখল করে আবেগ, আর নৈতিকতার জায়গা দখল করে অন্ধ আনুগত্য। এর ফলে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক চর্চা হারিয়ে ফেলে এবং একসময় ব্যক্তি নিজেই প্রতিষ্ঠানের বিকল্প হয়ে ওঠে। তখন দল আর আদর্শের বাহক থাকে না; দল পরিণত হয় একজন মানুষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আনুগত্যের বলয়ে। ইতিহাসে দেখা গেছে, ব্যক্তিপূজা শুরুতে আবেগের শক্তি তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত তা প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে দেয়। কারণ ব্যক্তি ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু প্রতিষ্ঠান দীর্ঘস্থায়ী। যে সমাজ ব্যক্তি-নির্ভর হয়ে পড়ে, সেখানে নেতৃত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আদর্শও অস্থির হয়ে যায়। ফলে রাষ্ট্রের ভেতরে স্থিতিশীল নৈতিক ভিত্তি গড়ে ওঠে না।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতিতে আত্মসমালোচনার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যায়। সেখানে সত্য বলার মানুষ কমে যায়, কারণ সবাই নেতা বা ক্ষমতাকেন্দ্রের সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে ভুল শুধরে নেওয়ার পরিবর্তে ভুলকে রক্ষা করার সংস্কৃতি তৈরি হয়। আর যখন কোনো সমাজ ভুলকে প্রশ্ন করার সাহস হারিয়ে ফেলে, তখন সেই সমাজ ধীরে ধীরে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে এগোতে থাকে। প্রকৃত গণতন্ত্র কখনো অন্ধ আনুগত্য শেখায় না; বরং শেখায় দায়িত্বশীল স্বাধীনতা। সেখানে নেতা সম্মানের পাত্র হতে পারেন, কিন্তু সত্যের ঊর্ধ্বে নন। কারণ গণতন্ত্রের চূড়ান্ত শক্তি কোনো ব্যক্তির জনপ্রিয়তায় নয়, বরং মানুষের বিবেকের স্বাধীনতায় নিহিত থাকে।ফলে মানুষ আদর্শের চেয়ে ব্যক্তির প্রতি বেশি অনুগত হয়ে পড়ছে। অথচ ইতিহাস বলে, ব্যক্তি ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু নৈতিক সত্য দীর্ঘস্থায়ী। তাই একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে কেবল তার অর্থনীতি বা রাজনৈতিক শক্তির উপর নয়, বরং সেই জাতির আত্মসমালোচনার সক্ষমতার উপরও। কারণ যে সমাজ নিজের ভুল দেখতে শেখে, সেই সমাজই একদিন নিজেকে সংশোধন করতে পারে। আর যে সমাজ অহংকারে নিজের পতনের লক্ষণও অস্বীকার করে, তার পতন শুধু সময়ের অপেক্ষা। অহংকারের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো সে পতনের শব্দ শোনার আগেই নিজেকে অমর মনে করতে শেখে। মানুষের মহান হওয়ার আকাঙ্ক্ষা কিংবা অমরত্বের প্রত্যাশা রাজনীতির ভাষায় শব্দদুটি আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক ও মহিমান্বিত মনে হলেও, বাস্তবতার গভীরে প্রশ্ন থেকে যায়, সেই মহত্ত্বের অভিযাত্রায় রাজনৈতিক দলগুলো কতখানি নিজেদের দলবাজি, রেষারেষি, সংকীর্ণতা ও কুৎসিত মানসিকতা থেকে মুক্ত করতে পেরেছে?
এই প্রশ্ন কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক অস্তিত্বেরও এক দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব। সত্য ও মিথ্যার সংঘাত যেমন যুগের পর যুগ মানুষকে বিভক্ত করেছে, তেমনি প্রতিহিংসা ও আত্মসিদ্ধির রাজনীতিও সমাজকে ক্রমাগত দ্বিখণ্ডিত করে রেখেছে। ক্ষমতার প্রতিযোগিতা যখন আদর্শকে ছাপিয়ে যায়, তখন রাজনীতি মানবকল্যাণের পথ থেকে সরে গিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রতিশোধের অস্ত্রে পরিণত হয়। এখন আমাদের ভাবতে হবে, হিংসা ও প্রতিহিংসার জন্ম কেন হয়? এর পেছনে বহু কারণ থাকলেও অন্যতম প্রধান কারণ হলো চরিত্রের অবক্ষয়। যখন অর্থ ও ক্ষমতার লোভ মানুষকে গ্রাস করে, যখন প্রভুত্বের অহংকার বিবেককে অন্ধ করে দেয়, তখন মানুষের ভেতরের মানবিকতা ক্ষয়ে যেতে থাকে। সভ্যতার মুখোশের আড়ালে তখন উন্মোচিত হয় এক ভয়ংকর নিষ্ঠুরতা।
প্রাণিজগতের সবচেয়ে ভয়াবহ হিংস্রতা অনেক সময় মানুষের মধ্যেই দেখা যায়। কারণ মানুষ কেবল শক্তির দ্বারা নয়, চিন্তা, কৌশল, লোভ ও প্রতিহিংসার মাধ্যমেও ধ্বংস সাধন করতে সক্ষম। তাই সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য কেবল রাজনৈতিক সংস্কার নয়, প্রয়োজন চরিত্রের পুনর্গঠন এবং মানবিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ।
মূল্যোবোধের পূনর্জগরণে সবচেয়ে বড় মাধ্যম হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা।
শিক্ষা মানুষের মেধাকে বিকশিত করতে পারে, কিন্তু সব শিক্ষা মানুষকে নৈতিক করে তোলে না। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো আমরা শিক্ষাকে ক্রমশ পেশা ও প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলছি, অথচ চরিত্র গঠনের প্রশ্নটিকে উপেক্ষা করছি। ফলে মানুষ জ্ঞান অর্জন করছে, দক্ষতা অর্জন করছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই বিবেকের গভীরতা অর্জন করতে পারছে না। শিক্ষা তখন আলোর পরিবর্তে কেবল সাফল্যের সিঁড়ি হয়ে ওঠে।
আসলে চরিত্র গঠন কোনো মুখস্থ বিদ্যার বিষয় নয়। এটি দীর্ঘ অনুশীলনের ফল। সত্য বলা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, ক্ষমতার মধ্যেও বিনয় ধরে রাখা, মানুষের প্রতি সহমর্মী হওয়া, এসব গুণ কেবল পাঠ্যবই পড়ে অর্জিত হয় না; এগুলো অর্জিত হয় সামাজিক চর্চা, নৈতিক পরিবেশ এবং আত্মশিক্ষার মাধ্যমে। একটি শিশুকে যদি ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় যে সফলতাই সবকিছু, তাহলে বড় হয়ে সে হয়তো ক্ষমতাবান হবে, কিন্তু মানবিক নাও হতে পারে। কারণ মানবিকতা প্রতিযোগিতার বিষয় নয়; এটি আত্মার শিক্ষার বিষয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা এখানেই যে, এখানে জ্ঞানের মূল্যায়ন আছে, কিন্তু নৈতিক সাহসের মূল্যায়ন খুব কম। একজন শিক্ষার্থী কত নম্বর পেল, কত বড় চাকরি পেল এসবকে আমরা গুরুত্ব দিই,  কিন্তু সে কতটা সত্যবাদী, কতটা দায়িত্বশীল, কতটা ন্যায়বোধসম্পন্ন মানুষ হয়ে উঠছে, সেই প্রশ্ন খুব কমই তোলা হয়। ফলে সমাজে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও, অনেক সময় নৈতিকভাবে পরিণত মানুষের সংকট থেকেই যায়। চরিত্র গঠনের জন্য প্রয়োজন এমন এক শিক্ষা, যেখানে আত্মসমালোচনার চর্চা থাকবে, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা থাকবে এবং মানুষের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ মূল্য হিসেবে শেখানো হবে। কারণ প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে শুধু দক্ষ করে না; তাকে বিনয়ীও করে। যে শিক্ষা মানুষের ভেতরে কেবল অহংকার তৈরি করে, কিন্তু দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে না, সেই শিক্ষা সমাজকে সভ্যতার বাহ্যিক সাজ দিতে পারে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তাকে শূন্য করে ফেলে। তাই একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে শুধু তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কিংবা প্রযুক্তিগত উন্নতির উপর নয়; বরং নির্ভর করে সেই জাতি তার নতুন প্রজন্মকে কতটা নৈতিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারছে তার উপর। কারণ জ্ঞান সভ্যতা নির্মাণ করতে পারে, কিন্তু চরিত্র ছাড়া সেই সভ্যতা টিকে থাকতে পারে না।
শিক্ষার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাষ্ট্র স্বীকৃত একাধিক ধারার শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা—প্রতিটি ব্যবস্থার নিজস্ব ঐতিহাসিক ও সামাজিক ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বহুমাত্রিক শিক্ষাব্যবস্থা একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা এবং নৈতিক বিকাশে কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে?
বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে ঘিরে এই প্রশ্ন আরও জটিল হয়ে ওঠে। কারণ এই শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য প্রধানত ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা ও ধর্মীয় নেতৃত্ব তৈরি করা। ফলে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি কিংবা উৎপাদনমুখী দক্ষতার সঙ্গে এর সংযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। বাস্তবতার দৃষ্টিতে দেখতে গেলে, দেশের শিল্প, গবেষণা, প্রযুক্তি, প্রশাসন কিংবা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক কর্মক্ষেত্রে কওমি শিক্ষিতদের অংশগ্রহণ এখনো খুব সীমিত। এই সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানেই ধর্মীয় শিক্ষাকে অস্বীকার করা নয়; বরং প্রশ্ন হলো একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতায় একটি শিক্ষাব্যবস্থা কতটা বহুমাত্রিক জীবনদক্ষতা তৈরি করতে পারছে। তবে এটিও সত্য যে, কওমি শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধ, নৈতিক শিক্ষা এবং আধ্যাত্মিক চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারক হিসেবে কাজ করেছে। গ্রামীণ সমাজে বহু মানুষ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষা, ধর্মীয় পরিচয় এবং সামাজিক আশ্রয় পেয়েছে। তাই এই ব্যবস্থাকে একেবারে অপ্রয়োজনীয় বলে দেখলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ উপেক্ষিত হবে। সমস্যা মূলত তখনই তৈরি হয়, যখন শিক্ষা কেবল একটি সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে বৃহত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তিত প্রয়োজনের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করতে ব্যর্থ হয়। বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতায় শিক্ষা শুধু ধর্মীয় বা তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, প্রযুক্তি, মানবিকতা, গবেষণা, সৃজনশীলতা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। একটি জাতি তখনই এগিয়ে যায়, যখন তার শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে শুধু অতীতের জ্ঞান নয়, ভবিষ্যতের সক্ষমতাও প্রদান করে। কিন্তু যদি কোনো শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর কর্মজগৎ, বিজ্ঞানমনস্কতা এবং সমকালীন বিশ্বের সঙ্গে সংলাপের সুযোগ না দেয়, তবে সেই শিক্ষার পরিসর ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে পড়ে। তাই প্রয়োজন সংঘাত নয়, বরং সংস্কার ও সমন্বয়। ধর্মীয় শিক্ষা তার নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ভূমিকা পালন করবে, কিন্তু সেই সঙ্গে আধুনিক জ্ঞান, বিজ্ঞান, ভাষা, প্রযুক্তি এবং উৎপাদনমুখী দক্ষতার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ কেবল অতীতের জ্ঞান দিয়ে ভবিষ্যতের রাষ্ট্র নির্মাণ সম্ভব নয়। একটি সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থা সেই ব্যবস্থাই, যা মানুষকে একইসঙ্গে নৈতিক, জ্ঞানসম্পন্ন, কর্মদক্ষ এবং মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। অবশেষে প্রশ্নটি কেবল কওমি শিক্ষা নয়; প্রশ্ন হলো—আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা কি এমন মানুষ তৈরি করছে, যারা শুধু সনদধারী নয়, বরং চিন্তাশীল, দায়িত্বশীল এবং উৎপাদনশীল? কারণ শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য কেবল পরীক্ষার ফলাফলে নয়, তা প্রতিফলিত হয় একটি জাতির সভ্যতা, কর্মসংস্কৃতি এবং নৈতিক চরিত্রে।
আর সেই ব্যবস্থার মাঝে শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের বড় সংকট দেখা যায়। একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেবল তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির উপর দাঁড়িয়ে থাকে না।
সেই ভবিষ্যতের গভীরে কাজ করে তার শিক্ষা ও চরিত্র গঠনের ভিত্তি। কারণ শিক্ষা যদি মানুষকে শুধু প্রতিযোগিতা শেখায়, কিন্তু মানবিকতা না শেখায়, তবে সেই শিক্ষা সমাজে দক্ষ মানুষ তৈরি করতে পারে, কিন্তু নৈতিক মানুষ তৈরি করতে পারে না। তখন জ্ঞান বাড়ে, কিন্তু বিবেকের পরিধি সংকুচিত হয়ে যায়। আমাদের সমাজে শিক্ষাকে ক্রমশ জীবিকা অর্জনের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে; অথচ শিক্ষার আরও বড় একটি উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে মানুষ করে তোলা। একসময় শিক্ষা মানে ছিল আত্মশুদ্ধি, মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ এবং সত্য ধারণের সাহস অর্জন। এখন শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রে সনদ, চাকরি এবং সামাজিক মর্যাদার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে চরিত্র গঠনের প্রশ্নটি ধীরে ধীরে পাঠ্যক্রমের বাইরের বিষয় হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জ্ঞান দিচ্ছে, কিন্তু সবসময় নৈতিক চেতনা জাগাতে পারছে না। পরিবার ব্যস্ত টিকে থাকার সংগ্রামে, সমাজ ব্যস্ত বাহ্যিক সাফল্যের প্রদর্শনীতে, আর রাজনীতি ব্যস্ত ক্ষমতার হিসাব-নিকাশে। এই বাস্তবতায় নতুন প্রজন্ম এমন এক পরিবেশে বেড়ে উঠছে, যেখানে সততার চেয়ে কৌশলকে, মানবিকতার চেয়ে প্রভাবকে, এবং নৈতিকতার চেয়ে সাফল্যকে বেশি মূল্যবান মনে করা হয়। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, সমাজ যখন দুর্নীতিবাজ, দখলদার কিংবা ক্ষমতালোভী মানুষদের প্রভাবশালী অবস্থানে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন তরুণদের ভেতরেও একটি বিপজ্জনক মানসিকতা জন্ম নেয়। তারা ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে আদর্শ নয়, বরং ক্ষমতাই সফলতার একমাত্র ভাষা। তখন শিক্ষা আর মুক্তির পথ থাকে না; তা হয়ে ওঠে প্রতিযোগিতামূলক এক বেঁচে থাকার কৌশল। অথচ প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে কেবল পেশাজীবী বানায় না; প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে আত্মসমালোচনা শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস দেয়, এবং ক্ষমতার মধ্যেও বিনয় ধরে রাখতে শেখায়। যে শিক্ষা মানুষের ভেতরে মানবিকতা জাগাতে পারে না, সেই শিক্ষা সভ্যতার বাহ্যিক কাঠামো নির্মাণ করতে পারলেও নৈতিক ভিত নির্মাণ করতে পারে না। তাই সমাজ ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের প্রশ্নে শিক্ষাকে শুধু দক্ষতা অর্জনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে চলবে না। শিক্ষা হতে হবে চরিত্র গঠনের এক গভীর নৈতিক সাধনা। কারণ ভবিষ্যতের রাজনীতি, সমাজ এবং রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে আজকের শিক্ষিত মানুষের বিবেক কতটা জীবিত আছে তার উপর। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সংকট বর্তমান সমাজ, রাজনীতি এবং শিক্ষাব্যবস্থার যে গভীর নৈতিক সংকট আমরা বিশ্লেষণ করেছি, তার সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর। কারণ প্রতিটি প্রজন্ম তার আগের প্রজন্মের চিন্তা, আচরণ ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বহন করে। আজকের মূল্যবোধ যদি দুর্বল হয়, তবে আগামী দিনের মননও সেই দুর্বলতার ছায়ায় গড়ে ওঠে। বর্তমান প্রজন্ম এমন এক বাস্তবতার মধ্যে বেড়ে উঠছে, যেখানে আদর্শের চেয়ে সাফল্য, নৈতিকতার চেয়ে প্রভাব, এবং সততার চেয়ে কৌশলকে বেশি কার্যকর বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে তারা ধীরে ধীরে এমন এক মানসিক কাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করছে, যেখানে প্রশ্ন থাকে—কে সঠিক? তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—কে সফল? এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সংকট হলো মূল্যবোধের স্থানচ্যুতি। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ—তিনটি প্রধান ভিত্তিই যখন একইসাথে চাপে থাকে, তখন শিশু ও তরুণদের ভেতরে একটি দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি হয়। একদিকে তারা বইয়ে নৈতিকতার কথা পড়ে, অন্যদিকে বাস্তবে দেখে ভিন্ন চিত্র। এই দ্বন্দ্ব দীর্ঘমেয়াদে বিশ্বাসের ভিতকে দুর্বল করে দেয়। ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভেতরে একটি বিপজ্জনক প্রবণতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে—আদর্শের প্রতি আস্থা কমে যাওয়া, এবং বাস্তবতাকে কেবল ক্ষমতা ও সুবিধার মানদণ্ডে বিচার করা। যখন একটি প্রজন্ম বিশ্বাস করতে শুরু করে যে নৈতিকতা দুর্বলদের জন্য, আর ক্ষমতা শক্তির একমাত্র ভাষা—তখন সমাজে মানবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। আরও গভীর সংকট হলো নেতৃত্বের চরিত্রগত রূপান্তর। আজ যেসব তরুণ সমাজকে দেখছে, তারা যদি দেখে যে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা স্বার্থপরতা সফলতার পথ তৈরি করছে, তবে ভবিষ্যতে তারা সেই কাঠামোকেই স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করতে পারে। তখন পরিবর্তনের বদলে অনুকরণই হয়ে ওঠে প্রধান প্রবণতা।
তবুও এই সংকট একমাত্র দিক নয়। ইতিহাস বলে, প্রতিটি অবক্ষয়ের ভেতরেই জাগরণের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। যদি শিক্ষা, পরিবার ও সমাজ আবারও চরিত্র গঠনের দিকে ফিরে যেতে পারে, যদি প্রশ্ন করার স্বাধীনতা এবং আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি পুনরুদ্ধার করা যায়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেবল সংকটের উত্তরাধিকারী না হয়ে পরিবর্তনের বাহকও হতে পারে। অতএব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়; এটি আমাদের বর্তমান সিদ্ধান্ত, মূল্যবোধ এবং আচরণেরই প্রতিফলন। আজ আমরা যা বপন করছি, আগামীকাল সেটিই রূপ নেবে সমাজের চরিত্রে।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর