
উপজেলা সংবাদদাতা, হাতিয়া : যে হাটে ভোর হলেই শুরু হতো হাঁকডাক, বরফ ভাঙার শব্দ আর ইলিশের ঝিলিক সেই হাট এখন নিস্তব্ধ। নেই ক্রেতার ভিড়, নেই মাছের ঝুড়ি নিয়ে ছুটে চলার ব্যস্ততা। নদীর ঘাটে সারি সারি নৌকা তোলা। কোথাও শুকাতে দেওয়া হয়েছে জাল, কোথাও পড়ে আছে খালি মাছের ডালা। চারপাশের এই নীরবতা যেন শুধু একটি বাজারের নয় নদীকে ঘিরে বেঁচে থাকা হাজারো মানুষের জীবনে নেমে আসা সাময়িক থমকে যাওয়ার ছবি।
মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে গত মধ্যরাত থেকে শুরু হয়েছে টানা ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। এ সময়ে সারা দেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত ও বিক্রি নিষিদ্ধ। নিষেধাজ্ঞার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে উপকূলীয় দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীদের জীবনে। নদী বন্ধ মানেই তাদের আয় বন্ধ। তাই মা ইলিশ রক্ষার এই উদ্যোগকে সমর্থন করলেও আগামী ২২ দিন কীভাবে সংসার চলবে সেই চিন্তাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে তাদের মনে।
নিষেধাজ্ঞার আগে শেষবারের মতো নদীতে গিয়েছিলেন অনেক জেলে। কেউ মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরেছেন, কেউ নৌকা তুলে রেখেছেন তীরে। কেউ আবার জাল শুকিয়ে গুছিয়ে নিয়েছেন পরবর্তী যাত্রার জন্য। নৌকার ইঞ্জিন, জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম মেরামতের কাজেও ব্যস্ত সময় পার করছেন অনেকে।
বাংলাবাজার ঘাটের মাছ ব্যবসায়ী আবদুর রহিম বলেন, “নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে মাছের ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। এই কয়েক দিন কীভাবে সংসার চলবে, সেটাই এখন বড় চিন্তা। তবে মা ইলিশ রক্ষা করতে হলে নিষেধাজ্ঞা মানতেই হবে।
হাতিয়ার জেলেপল্লিগুলোতে কথা বলে জানা গেছে, নদীই তাদের প্রধান অবলম্বন। মাছ ধরার আয় দিয়েই চলে পরিবারের খাবার, সন্তানদের লেখাপড়া, নৌকার কিস্তি, জাল কেনা ও নিত্যদিনের খরচ। একটানা ২২ দিন নদীতে যেতে না পারায় তাই তাদের আয়-রোজগারে বড় ধরনের ধাক্কা আসবে।
জেলে সাদ্দান মাঝি নদীর পাড়ে নৌকা তুলে জাল শুকাচ্ছিলেন। নৌকার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, “নদীতে যেতে পারব না, তাই নৌকাটা তীরে তুলে রাখলাম। কয়েকটা দিন কষ্ট হবে। কিন্তু নদীতে মাছ থাকলে আমরাও বাঁচব।”
সাদ্দান মাঝির এই কথাতেই যেন ধরা পড়ে উপকূলের জেলেদের বাস্তবতা। আজকের কষ্ট মেনে নিয়ে আগামী দিনের মাছের আশায় তারা নদীকে বিশ্রাম দিতে প্রস্তুত। তাদের বিশ্বাস, মা ইলিশ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়তে পারলে ভবিষ্যতে নদীতে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে। আর সেই মাছই একদিন আবার ফিরিয়ে আনবে তাদের জীবিকার স্বস্তি।
তবে নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন শুধু জেলেদের জন্য নয়, মাছ ব্যবসায়ীদের জন্যও কঠিন সময়। মাছের আড়ত, পরিবহন, বরফ ব্যবসা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পেশার মানুষের আয়ও কমে যাবে। ফলে নদীকেন্দ্রিক একটি বড় অর্থনৈতিক চক্রই সাময়িকভাবে স্থবির হয়ে পড়বে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা সফল করতে নদীতে মাছ ধরা বন্ধের পাশাপাশি বাজারে ইলিশের অবৈধ মজুত, পরিবহন ও বিক্রি কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার সুযোগে জেলেদের হয়রানি কিংবা অবৈধভাবে অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঠেকাতে হবে।
কারণ নিষেধাজ্ঞা কেবল কাগজে থাকলে মা ইলিশ রক্ষা সম্ভব নয়। নদীতে নজরদারি, বাজারে অভিযান এবং জেলেদের জন্য সরকারি সহায়তা সবকিছু একসঙ্গে নিশ্চিত করলেই এর সুফল মিলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে হাতিয়ার নদী ও মাছের হাটগুলোতে নজরদারি জোরদারের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ শিকার, পরিবহন, মজুত বা বিক্রি করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
দিন শেষে নদীর পাড়ে পড়ে থাকে সারি সারি নৌকা। শুকাতে দেওয়া জালের পাশে বসে থাকেন জেলেরা। যে নৌকাগুলো প্রতিদিন ভোরে ছুটে যেত নদীর বুকে, সেগুলো এখন নিশ্চুপ। যে হাতিয়ার মাছের হাটে ইলিশের ঝিলিক আর মানুষের কোলাহলে সকাল শুরু হতো, সেখানে এখন বাতাসে ভেসে বেড়ায় এক অদ্ভুত নীরবতা।
নদীকে ২২ দিনের বিশ্রাম দিয়ে অপেক্ষা করছেন জেলেরা নদী আবার মাছভরা হয়ে ফিরবে, জালে উঠবে রুপালি ইলিশ, আর প্রাণ ফিরে পাবে হাতিয়ার নিস্তব্ধ মাছের হাট।
আপনার মতামত লিখুন :