• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ৭ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৭ অক্টোবর, ২০২৫
সর্বশেষ আপডেট : ৭ অক্টোবর, ২০২৫

নোয়াখালী বিভাগ সময়ের দাবি – সাব্বির ইবনে ছিদ্দিক

বাংলাদেশে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও সুষম উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে নতুন বিভাগ গঠনের দাবি বহুদিনের। সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন নোয়াখালী। ইতিহাস, ঐতিহ্য, জনসংখ্যা, ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিক থেকে নোয়াখালী বহু আগেই বিভাগীয় মর্যাদা পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে বলে মনে করেন স্থানীয় উন্নয়নকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা।

তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে— কেন এখনো “নোয়াখালী বিভাগ” বাস্তব রূপ পেল না?
বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগে ১১টি জেলা রয়েছে। এত বড় ভৌগোলিক এলাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুর নিয়ে নতুন বিভাগ হলে সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো আরও সহজ হবে।
এই অঞ্চল দেশের অন্যতম উদীয়মান অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে দ্রুত বিকশিত হচ্ছে
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর (কোম্পানীগঞ্জ): দেশের বৃহত্তম শিল্প এলাকা, যেখানে হাজারো কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে।

ফেনী অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মহিপাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডর: দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে শিল্পায়নের নতুন দিগন্ত।
লক্ষ্মীপুর ও হাতিয়ার উপকূলীয় মৎস্য সম্পদ: জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

একটি বিভাগ গঠিত হলে এসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা সহজ হবে, যা জাতীয় উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে।
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, পলিটেকনিক ও নার্সিং কলেজসহ বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে। ফেনী ও লক্ষ্মীপুরেও কারিগরি ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে দক্ষ মানবসম্পদের যোগান বিভাগ পরিচালনার জন্য প্রস্তুত।

১৮২১ সালে গঠিত নোয়াখালী জেলা একসময় বৃহত্তর ত্রিপুরার অংশ ছিল। এখান থেকেই পৃথক হয়েছে ফেনী ও লক্ষ্মীপুর। ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও ঐতিহ্যের দিক থেকে তিন জেলা একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এ ঐতিহাসিক বন্ধনই নোয়াখালীকে স্বাভাবিকভাবেই একটি নতুন বিভাগের দাবিদার করে তোলে।
বাংলাদেশের দীর্ঘতম উপকূলরেখার একটি বড় অংশ নোয়াখালীর আওতায়। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখানে সরাসরি অনুভূত হয়। বিভাগ হলে উপকূলীয় উন্নয়ন, পুনর্বাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

নোয়াখালী জেলা সদরে বিভাগীয় প্রশাসনের জন্য প্রয়োজনীয় ভবন, আবাসন ও যোগাযোগ অবকাঠামো এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।
বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দপ্তর গঠনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় প্রয়োজন।

প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসে চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা অঞ্চলের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে— যা কিছু প্রভাবশালী মহলের আপত্তির কারণ হতে পারে।
হাতিয়া, নিঝুমদ্বীপের মতো চরাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ দুর্বল; সড়ক ও নৌযান সংযোগ উন্নত না হলে কার্যকর প্রশাসন চালানো কঠিন।
নতুন বিভাগ গঠনে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকার ব্যয় অনুমান করা হয়— যা সরকারের জন্য বড় আর্থিক চাপ হতে পারে।

নোয়াখালী বিভাগ গঠনের দাবি এখন রাজনৈতিক স্লোগানের বাইরে গিয়ে একটি জনদাবিতে রূপ নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গণস্বাক্ষর অভিযান ও মানববন্ধনের মাধ্যমে নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষ্মীপুরের মানুষ এই দাবিতে ঐক্যবদ্ধ।
সরকারি সূত্রে জানা যায়, প্রশাসনিক পুনর্গঠন কমিশন নোয়াখালী, ফরিদপুর ও ময়মনসিংহ—এই তিন অঞ্চলকে নতুন বিভাগ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। ময়মনসিংহ বিভাগ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত; বাকি দুটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত “নীতিগতভাবে বিবেচনাধীন”।

সবদিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়— নোয়াখালী বিভাগ গঠন সময়োপযোগী, বাস্তবসম্মত এবং দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য প্রয়োজনীয়। তবে অবকাঠামোগত প্রস্তুতি, আর্থিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া এটি কার্যকর হবে না।

নোয়াখালী বিভাগ গঠনের মাধ্যমে শুধু প্রশাসনিক সেবা নয়, উপকূলীয় অঞ্চলের জীবনমান ও অর্থনৈতিক সক্ষমতাও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে— যা জাতীয় উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর