
বাংলাদেশের রাজনীতি যেন আবার জেগে উঠছে। নোয়াখালীর অলিগলি, হাট-বাজার, চায়ের দোকান সবখানেই এখন আলোচনার কেন্দ্রে ধানের শীষ। বিএনপির ছয় আসনে একযোগে প্রার্থী ঘোষণা করার পর জেলায় যে উৎসবের আবহ সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু একটি দলের নির্বাচনী প্রস্তুতি নয় এটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রাণ ফিরে পাওয়া গণতন্ত্রের নবজাগরণেরও প্রতীক।
দীর্ঘ রাজনৈতিক স্থবিরতা ও একমুখী নির্বাচনী সংস্কৃতির পর এই উচ্ছ্বাস জাতির অন্তরে এক নতুন আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছে।
যে গণতন্ত্র অনেকটা নিঃশ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় ছিল, নোয়াখালী যেন সেই গণতন্ত্রের প্রথম উচ্ছ্বাসময় নিশ্বাস।
গত ১৬ বছর বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতি অনেকটাই একমুখী হয়ে পড়েছিল। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন যেন হারিয়ে গিয়েছিল রাজনৈতিক অভিধান থেকে। বিরোধী দল মাঠে ছিল না, প্রশাসন ছিল প্রভাবশালী, আর ভোটাররা ছিল নীরব পর্যবেক্ষক।ফলে জনগণের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি।
এই বাস্তবতায় বিএনপির পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রার্থী তালিকা ঘোষণা বিশেষ করে নোয়াখালীর মতো ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক জেলার ছয়টি আসনে সক্রিয় উপস্থিতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে বলছেন নীরবতার দেয়াল ভেঙে ওঠা প্রথম গণতান্ত্রিক পদক্ষেপ।
নোয়াখালী সবসময়ই রাজনীতির উর্বর ভূমি। মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে গণআন্দোলন প্রতিটি যুগে এই জেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।এখানকার জনগণ রাজনীতিতে সচেতন, সংগঠিত এবং মতপ্রকাশে সাহসী।
বিএনপির ঘোষিত প্রার্থীরা যেমন ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, জয়নুল আবদীন ফারুক, বরকত উল্লা বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম ও মাহবুবের রহমান শামীম তারা সবাই মাঠপর্যায়ে অভিজ্ঞ, পরিচিত মুখ।
এই অভিজ্ঞ নেতৃত্বই হয়তো তৃণমূলের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।
মনোনয়ন ঘোষণার পর দেখা গেছে এক বিরল দৃশ্য দলীয় ভেদাভেদ ভুলে সবাই মাঠে নেমেছে, উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে প্রচারণা।চায়ের দোকান থেকে মসজিদের বারান্দা পর্যন্ত এখন আলোচনায় শুধু নির্বাচন। দীর্ঘদিন বিএনপির ভেতরে বিভাজন, হতাশা ও নেতৃত্ব সংকট বিরাজ করেছিল। এবার যেন সেটি কাটিয়ে ওঠার ইঙ্গিত মিলছে।তরুণ প্রজন্ম ও ছাত্রদলের উচ্ছ্বাস, নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ কর্মযজ্ঞ সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছে একটি পুনরুজ্জীবিত দলের।
এটি শুধু একটি নির্বাচনী প্রস্তুতি নয়, বরং একটি মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আমরা পারি বিশ্বাসের পুনর্জন্ম।রাজনীতি তখনই শক্ত হয়, যখন নেতারা মাঠে থাকে, কর্মীরা সক্রিয় থাকে, এবং জনগণ অংশ নেয়।
এই তিন উপাদান একত্রে নোয়াখালীতে উপস্থিত হয়েছে বলেই সেখানে সৃষ্টি হয়েছে এক গণউত্তেজনা, যা পুরো দেশের রাজনীতিকেও প্রভাবিত করতে পারে।
গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায়, মতের বৈচিত্র্যে।যখন প্রতিযোগিতা থাকে না, তখন রাজনীতি রূপ নেয় ক্ষমতার একক মালিকানায়।বাংলাদেশের বিগত নির্বাচনী ইতিহাসে আমরা দেখেছি অংশগ্রহণহীন নির্বাচন কতটা জনগণকে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে।আজ নোয়াখালীর চিত্র তার বিপরীত এখানে ভোটাররা আগ্রহী দলগুলো প্রস্তুত প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাস্তব।এটাই গণতন্ত্রের প্রাণ।
বিশ্ব ইতিহাসে দেখা গেছে, গণতন্ত্র কখনও স্থবিরতায় টিকে থাকে না। ১৯৭০-এর দশকে দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা ১৯৯০-এর দশকে ইন্দোনেশিয়া উভয় দেশেই বিরোধী দলের অংশগ্রহণই তাদের গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রেখেছিল।বাংলাদেশও আজ সেই পথেই হাঁটছে বিরোধী দল মাঠে ফিরলে রাজনীতিও প্রাণ ফিরে পায়।তবে এই উচ্ছ্বাসকে বাস্তব রূপ দিতে হলে সামনে অনেক চ্যালেঞ্জও আছে।প্রথমত, উদ্দীপনাকে ভোটে রূপান্তর করা যা সবচেয়ে কঠিন কাজ।
দ্বিতীয়ত প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।তৃতীয়ত, সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী আচরণ বজায় রাখা।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, অতিরিক্ত উত্তেজনা ও সহিংসতা গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ করেছে।সুতরাং এখন প্রয়োজন সংযম, ধৈর্য ও পরস্পরের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা।বিএনপি যদি মাঠে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিযোগিতা করতে পারে,বাংলাদেশ জামাতে ইসলামী বা অন্যান্য দল বা আওয়ামী লীগ যদি সেই প্রতিযোগিতাকে স্বাগত জানায় তবে এ নির্বাচন হতে পারে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন দৃষ্টান্ত।
গণতন্ত্র কেবল ভোটের দিনে সীমাবদ্ধ নয়।
এটি প্রতিদিনের চর্চা মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা, বিরোধিতাকে স্থান দেওয়া, এবং জনগণের সিদ্ধান্তকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া।প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন কমিশনের দৃঢ়তা, মিডিয়ার স্বাধীনতা ও নাগরিকের মত প্রকাশের অধিকার এই চার স্তম্ভ ছাড়া কোনো গণতন্ত্রই স্থায়ী হয় না।বাংলাদেশে এই গণউত্তেজনা যদি সত্যিকার অর্থে স্বচ্ছ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় রূপ নেয়, তবে সেটি হবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো পুনর্গঠনের এক বাস্তব সূচনা।
নোয়াখালীর নির্বাচনী জোয়ার শুধু একটি দলের জয়ের আকাঙ্ক্ষা নয় বিভিন্ন দল জামায়াত থেকে শুরু করে অন্যান্য দলগুলিও এটি গণতন্ত্রের প্রাণ ফিরে পাওয়ার এক প্রতীকী মুহূর্ত।বাংলাদেশের জনগণ রাজনীতিতে অংশ নিতে চায়, নিজেদের মত দিতে চায়, এবং তাদের ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে চায়।ধানের শীষের বা দাঁড়িপাল্লা বা অন্যান্য দলগুলো এই জোয়ার সেই চিরচেনা রাজনৈতিক প্রানচাঞ্চল্যেরই পুনরাগমন।এখন দেখার বিষয় এই উচ্ছ্বাস কি সত্যিই ভোটের বাক্সে গণতন্ত্রের বিজয়ে পরিণত হয়, নাকি আবারও ইতিহাসের এক সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়।দেশজুড়ে আজ তাই প্রশ্ন একটাই বাংলাদেশে কি এবার গণতন্ত্রের নতুন অধ্যায় রচনার সূচনা করবে?
নাকি পুরনো খাতার হিসাব কিতাব আবার বাংলাদেশের সূচনা হবে এটি এখন শুধু দেখার বিষয়। গণতন্ত্র ফিরে কি প্রত্যাশায় আজ মানুষের মাধ্যমে এক স্বপ্নই শুধু বাংলাদেশে গণতন্ত্র পূণ্য জাগ্রত হোক।
লেখক : স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক নোয়াখালীর কথা
আপনার মতামত লিখুন :