
রক্তমাখা মাথায় হাত চেপে রেখে সেবন্তী দাঁড়িয়ে আছে সদর দরজার পাশে । চুল এলোমেলো, ঠোঁট কিঞ্চিৎ ফোলা, তবুও শাড়ীর আঁচল দিয়ে ঠোঁট ঢেকে চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । চোখেমুখে বেদনার চাপ আঁকা, কণ্ঠস্বর নিস্তব্ধ। চিৎকার করার শক্তিটুকু হারিয়ে গেছে সহসা। অন্ধকারের আবছা আলোতে দেয়ালের সাথে জোরে ধাক্কা খেয়েছে , কিন্তু এটা স্বাভাবিক নয় ; কেউ তাকে ইচ্ছে করে এমনটা করেছে। ধাক্কা খেয়েও একবার সে পিছনে তাকালো , মনে হচ্ছে খুব পরিচিত কেউ ধাক্কা দিয়ে দৌঁড়ে পালিয়ে গেল। সে চিনেছে, তবুও কিছু বললো না। একটি বিস্ময়কর রেখা ভেসে ওঠলো তার চোখে! তবুও একটা টুঁশব্দ পর্যন্ত করেনি, সে যেন এক মানব রোবট।
সেবন্তীর স্বামী রাশেদুল সকালে বাড়ি থেকে বের হয়েছে, এখনো ফিরেনি। তার শাশুড়ী তাকে তেমন দেখতে পারে না। কেনো দেখতে পারে এটার কোনো কারণ তার জানা নেই। তবুও সবকিছু ভুলে সেবন্তী তার শ্বাশুড়িকে ডাক দিয়েছে। তার কপাল ভরে আছে রক্তে। নতুন শাড়ীর হলুদ রংঙের আঁচল পুরোপুরি লাল হয়ে আছে। কিছুক্ষণ ডাকাডাকি করার পর সেবন্তীর শ্বাশুড়ি শিউলি বেগম বের হয়েছে। এসেই মুখ ঘুরিয়ে বলে উঠলো
— নতুন বিয়ে হতে না হতেই মাথা ফাটিয়ে ফেললে ? চলাফেরার আর হুশ আসবে কবে ? নাকি দালান দেখে চোখ উপরে উঠে গেছে ? সেবন্তী শুনে চুপ হয়ে রইলো, আর কিছুই বললো না। সেবন্তী গরিব ঘরের মেয়ে হলেও যথেষ্ট রূপবতী এবং সহজ-সরল, অদ্ভুত তার চোখের মায়া।পৃথিবীর জটিল মহাগ্রন্থ যেন লুকিয়ে আছে তার চোখ জোড়ায় ।
তাদের টিনের ঘর, ভাঙাচোরা, অসুন্দর । তাই যে কারো অবহেলা কিংবা কটাক্ষ করা খুব সহজ মেনে নেয়া যায়। এক জীবনে মানুষকে অনেক কিছু সহ্য করার ক্ষমতা রাখতে হয়, তা না হলে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে ।
তাই এগুলো কানে না নিয়ে একটুপর উঠে রান্না ঘর থেকে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিলো।রক্ত এখনো পড়ছে অবিরত। মাঝেমাঝে কিছু মানুষ অকালে দুঃখ পায়, সৃষ্টিকর্তা মনে হয় খুব পছন্দ করে তাদেরকে দুঃখগুলো উপহার পাঠায়। সেবন্তীরও হলো তাই। কান্না করাও মানায় না তাকে , তাই আর কাঁদছে না। তবে ভীষণ ভাবে মন খারাপ । ভাগ্যের নির্মমতায় কাকে দায় দিবে সে হিসেব তার মাথায় ঢুকছে না! তবে এটা জানে যে, সব দোষ ভাগ্যের। মানুষের নাকি একজীবনে সুখ আরেক জীবনে দুখ থাকে, কিন্তু সেবন্তী জানে তার দুই কালেই দুঃখ ভরা , বিধাতার মনে হয় সুখ লিখতে গিয়ে কালি শেষ হয়ে গেছে। এসব নানা আফসোস নিয়ে সিঁড়িতে বসে পড়লো ।
সেবন্তীর বুক ফেঁটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে শোকের করুণ আর্তনাদে, তবুও সে মুখ ফুটে কিছুই বললো না। বিয়ে হলো মাত্র ২৭ দিন। তার গা থেকে এখনো যেন কাঁচা হলুদের গন্ধ কাটেনি, এখনো হাতে হেসে আছে মেহেদীর রং ; এর মধ্যে যদি কেউ শুনে তাকে ধাক্কা দিয়ে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে তাহলে হয়তো কেউ বিশ্বাস করবে না। বড় ভয় হলো তার ফ্যামিলি শুনলে অনেক কষ্ট পাবে। সেবন্তীর বাবা সেলিমুজ্জামান অনেক কষ্টে অর্থ জোগাড় করে তার বিয়ে দিয়েছে, ঘরে এখনো পড়ে আছে ছোট দুটি বোন। তাদের ৩ বোনের মাঝে একটি মাত্র ভাই, সবেমাত্র চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে।
সেলিমুজ্জান কয়েক বছর আগে স্কুলের চাকরি হারিয়েছে চেয়ারম্যানের লুটের কথা সাংবাদিকের কাছে বলে দেয়াতে। এটা নাকি সরকারের দলীয় লোকের গায়ে পড়েছে। একপর্যায়ে সবাই মিলে সেলিমুজ্জামের পিছনে লেগে নানা মিথ্যা অপবাদ দিয়ে চাকরী থেকে পদত্যাগ করিয়েছে। সে থেকে ফ্যামিলির অবস্থা অতি দূর্বল। বিয়ের আগে সেবন্তী একটি অফিসে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে চাকরী করতো, ৭ হাজার টাকা বেতন। এলাকার পোলাপান কুরুচিপূর্ণ আচরণ করার কারণে সেবন্তীর বাবা সেলিমুজ্জান সেই চাকরী আর করতে দেয়নি।
সিঁড়িতে বসে জ্যোৎস্না চেয়ে আছে সেবন্তী । দূরের মাঠে হেমন্তের থোকা থোকা ধান, জোনাক জ্বলা রাত, আকাশে নক্ষত্রের সমাগম , সবকিছু মিলিয়ে মন ভালো থাকার মতো ওয়েদার। তবে হাতে একটা কবিতার বই থাকলে ভালো হতো , মন ভরে পড়া যেত। এই ভেবে তার আবার আফসোস হচ্ছে যে, তার কাছে কেনো কবিতার বই নাই!! কিন্তু হঠাৎ এইসব তার আর ভালো লাগে না, মন যেন কেমন কেমন করছে। একপ্রকার ভয় ভয় যেন। অথচ সে কখনো ভয় পায় না , তবুও আচমকা কিসের যেন ভয় লুকিয়ে আছে।
এমুহূর্তে তার সবচেয়ে বড় ভয় হলো তার স্বামী রাশেদুলকে নিয়ে। রাশেদুলের কেনো জানি মন খারাপ ; সারাদিন মুখ কালো করে বসে থাকে , ঘর থেকে বের হয়ে বারান্দায় বসে থাকে সারাক্ষণ। মাঝেমাঝে সেবন্তীর দিকে বিস্ময়কর ভাবে তাকিয়ে থাকে , একটা দু’টো কথাও হয়। রাশেদুলের মন ভালো, তবে তাকে কান পড়া দেয় তার বড় বোন আলেয়া। আলেয়া বিয়ের পর থেকেই বাপের বাড়িতে থাকে , সঙ্গে তার ২ছেলেও। আলেয়ার স্বামী থাকে মালয়েশিয়ায় ।
সারাদিন ভিডিও কলে কথা বলা, আর বিয়ের পর রাশেদুলকে কানপড়া এবং সেবন্তীকে লাল মরিচের ভাপ দেয়া ছাড়া আপাততঃ আলেয়ার আর কোনো কাজ নেই। রাশেদুল যখনই ভাবে আজকে সেবন্তীর সাথে মন খুলে কথা বলবে কিংবা ঘুরতে যাবে ঠিক তখনই আলেয়া এসে হাজির হবে অদ্ভুত সব দাবীদাওয়া নিয়ে। এটা কেনো আনলো না, এটা কেনো দিলো না, এইসব নিয়ে নানান ঝামেলা। সঙ্গে’তো কলুরবলদের মতো মরার খাটুনি আছেই । আলেয়ার জামাকাপড়গুলোও সেবন্তীকে দিয়ে ধুয়ে নেয়। এইসব রাশেদুলের পছন্দ হয় না, মুখ খুলে ঘরের মধ্যে কিছু বললে সবাই বলে ওঠে বউয়ের পক্ষ নেয় সে। তাই সেবন্তীর পক্ষেও কিছু বলে না।
মূল সমস্যা হচ্ছে সে আপাততঃ বেকার। বিয়ের ৩ মাস আগে সেলসম্যানের চাকরিটা হারিয়েছে। এইসব নানান চিন্তায় সেবন্তীর মন খারাপ । আজকে সেই যে সকালে বাড়ি থেকে বের হয়েছে, এখনো আসার কোনো নাম নেই। রাশেদুল কখন আসবে এই চিন্তায় সেবন্তী আরো অস্থির।
সেবন্তী সংসারের দিক দিয়ে হয়তো একটু অসুখী কিন্তু স্বামীর দিক দিয়ে সে সুখী। রাশেদুলকে দেখে তার ভালোই মনে হয়, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে লোকটা এতকিছু দেখেও সহ্য করে, চুপ করে বসে থাকে। মাঝেমাঝে রাগ হয়, আবার মাঝেমাঝে হয় না। স্বামীর উপরে রাগ করেত নেই, রাগ রাখতে নেই ঝাউগাছের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো লেগে আছে সেবন্তীর চোখে , চোখ বেয়ে বেয়ে গড়িয়ে পড়ে কান্নার জল। তার বাবার কথা মনে হলে কান্না আসে। তার বাবা সেলিমুজ্জান অনেক আনন্দ নিয়ে তাকে বিয়ে দিয়েছে। পৃথিবীর সকল বাবা চায় তার মেয়েকে ভালো ফ্যামিলিতে বিয়ে দিতে। মেয়ের বাবারা কেবল মেয়ের সুখ দেখে যেতে চায়। , এতেই যেন তাদের সব পাওয়া হয়ে যায়। সেবন্তী গরিব ঘরের মেয়ে, গরীব হলেও তার মন বড়। সে খুব করে চায়, স্বামীকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখতে। ছোট বেলায় শুনে এসেছে, স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেস্ত।
স্বামীর সাথে খারাপ আচরণ করতে ইসলামে না করেছে, এটা হারাম, অন্যায়। আর এমনিতেই বাঙালি মেয়েরা স্বামীকে মাথার মুকুট করে রাখে।
বিয়ের সময় রাশেদুলকে একটা বাইক দেয়ার কথা ছিলো, ঘটক নিজ থেকে বলেছে যে আপনারা ছেলেকে একটা বাইক কিনে দিবেন, আমি ছেলে পক্ষকে বলে দিয়েছি। সেলিমুজ্জান কিছুই বললো না। ঠিকমতো খাওয়ার জোটে না, বাইক কিনবে কেমনে ?
এটা নিয়ে রাশেদুলের কোনো অভিযোগ নেই। তার কিছুই চায় না , সেও মুখে কখনো বলেনি। শুধু তাই নয়! সেবন্তীর রূপসৌন্দর্য্য নিয়েও কিছু বললো না। রাশেদুলকে দেখে সেবন্তীর ভালোই লাগে, একদম সহজ-সরল মানুষ । আজকাল পৃথিবীতে এরকম মানুষের খুব অভাব । চারদিকে এতোসব ছলাকলার মধ্যেও এরকম মানুষ থাকাটা বিস্ময়কর।
রাত তখন ১১টা ৫৪ মিনিট, গুড়গুড়ে অন্ধকার । ঝোপঝাড় বাড়ির উঠোনের দিকে কে যেন আসছে ।
সেবন্তী উঠে দাঁড়াল , চোখেমুখে তার কেবলই দুশ্চিন্তা আর শঙ্কা! মাঝেমাঝে রাশেদুল বাড়িতে ফিরে না, কাছাকাছি আসলে হয়তো দেখা যাবে যে এটা রাশেদুল না। তাই তার টেনশন হচ্ছে। সেবন্তী অপেক্ষায় আছে সে আগ বাড়িয়ে রাশেদুলকে হাত ধরে সিঁড়িতে উঠাবে, হাত মোছার জন্য তোয়ালে এনে দিবে , টেবিলে গরম ভাত বেড়ে দিবে, সঙ্গে পাবদা মাছের ঝোল ঝোল তরকারি। পাবদা মাছ তার খুবই পছন্দের।
দূর থেকে পায়ের শব্দ আর উঠোনের বাতির আলোতে সেবন্তী বুঝে গেলো এটা তার স্বামী । সে কেবল মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে। শুধু আজকে নয়, বিয়ের পর থেকে প্রতিদিন এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে।
মাঝেমাঝে রাশেদুল একপ্রকার লজ্জা পায়, সেবন্তীকে এভাবে দাঁড়াতে নিষেধও করতে পারে না। যাওয়ার সময় শুধু বলে যায়, বারান্দায় একা একা দাঁড়িয়ে থেকো না । সেবন্তী তবুও দাঁড়িয়ে থাকে, চেয়ে থাকে মুগ্ধ চোখে। অপেক্ষা করাটা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মুহুর্তের মধ্যে একটি। কিছু কিছু অপেক্ষা আছে বেদনার। দেখা গেছে কেউ একজন কারো জন্য উৎসব নিয়ে অপেক্ষা করতেছে, কিন্তু মানুষটা ফিরলো না। তখন তার দুঃখ হবে। কোন এক চাকরী প্রার্থী কর্তপক্ষের মেসেজের জন্য অপেক্ষা করে, মেসেজটা আসলেই তার চাকরী কনফার্ম। কিন্তু দেখা গেছে তার আর মেসেজটা আসলো না।
রাশেদুল সেবন্তীর কাছাকাছি আসা মাত্রই হাহুতাশ হয়ে উঠল ! সেবন্তীর কপাল বেয়ে রক্ত পড়ছে, শাড়ি লাল হয়ে আছে, এটা দেখেই সে চেচামেচি করা শুরু করে দিয়েছে। সেবন্তীকে বললো , তুমি এ অবস্থায় এখানে দাঁড়িয়ে থেকেছ কেনো ?
সেবন্তী মৃদু হেসে বললো, তেমন কিছু হয়নি, তুমি টেনশন করিও না। সেবন্তীর কণ্ঠস্বর শুনে সে বুঝে গেলো অনেক কিছু হয়েছে।
চেচামেচি করাতে ঘর থেকে সবাই বের হয়েছে , কিন্তু বের হলেও কারো চোখেমুখে তেমন কোনো পরিবর্ত নেই। রাশেদুল একপ্রকার অবাক হলো! তার আর বোঝার বাকি নেই , এ বাড়ির মানুষ কেমন।
সে একাই সেবন্তীকে ধরে ঘরে নিয়ে যাচ্ছে, এতেও তার বোন আলেয়া নাক বাঁকা-বাঁকি শুরে করে দিয়েছে। রাশেদুল এ-সব কিছু পাত্তা দিলো না আর৷
সেবন্তীকে ঘরে নিয়ে সোফায় বসালো। পরিষ্কার পানি দিয়ে আঘাতের জায়গাটা ভালোভাবে ধুয়ে পিওভিডিন আয়োডিন লাগিয়ে কাপড় দিয়ে বেঁধে দিয়েছে। বারবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ।
রাশেদুল সেবন্তীর দিকে তাকিয়ে মনমরা হয়ে আছে। চোখে চোখ রেখে বলল – তোমার সাথে একপ্রকার অন্যায় হয়ে যাচ্ছে না ? আমাকে তুমি ক্ষমা করো । আজ থেকে আমার আর ভুল হবে না , তোমাকে আমি আর দূরে সরাবো না। সেবন্তী কিছু বললো না আর। চাপাকান্না লুকিয়ে রেখে কেবলই স্তব্ধ হয়ে আছে। ঠোঁটের কোনায় যে মৃদু হাসি, সেটাও বিষণ্ণতায় ভরা৷
সেবন্তী জানে — রাশেদুল কখনোই তার পক্ষে থাকবে না , এতোকালও থাকেনি। যদি সে পক্ষেই থাকতো তাহলে অন্তত এগুলো হতো না ।
সেবন্তি কাউকে বলতে পারে না তাকে কি নির্মম মানসিক টর্চার চালায় , তার স্বামীকেও না। আজকে তাকে আলেয়া ইচ্ছে করেই ধাক্কা দিয়েছে , সে তবুও মুখ খুলে কাউকে বলেনি। তার স্বামীকে বললেও লাভ নেই, সে কিছু বলবে না। শুধু বলবে, একটু ধৈর্য ধরে থাকো। পক্ষে গিয়ে কি করবে আর ? সে তো আর বড়লোক ঘরের মেয়ে না, তাই তাকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে দুঃখ দেয়া যায়।
রাশেদুল সেবন্তীর হাত ধরে ক্ষমা চাইলো। সেবন্তী একপ্রকার অবাক হয়ে হাত সরিয়ে ফেললো।
— সে কী !! এমনটা করতে নেই! স্বামীদের কোনো ভুল নেই , ভুল থাকতে পারে না। সব দোষ ভাগ্যের। যে মেয়ের ভাগ্য যত ভালো, সে তত বেশী সুখী। যার ভাগ্য খারাপ, সে তত বেশী দুখী।
সেবন্তী ঢুকরে কেঁদে ওঠে কাঁচ ভাঙা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সেথায় সহসা উড়ে গেলো একটি বেদনার লক্ষ্মীপেঁচা ।
আপনার মতামত লিখুন :