‘কে হবে হাতিয়ার রূপরেখা পরিবর্তনের কারিগর’ – এম এ জিন্নাহ

হাতিয়া বাংলাদেশের একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চল উপজেলা । ২১শত বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপাঞ্চল উপজেলাটি কেবল একটি ভূমি নয়, এটি জীবন-সংগ্রাম, সংকল্প, এবং স্বপ্নের দৌরাত্ম্য নিয়ে নির্মিত , এটাই এখানকার মানুষের প্রধান ভূমিকা। সমুদ্রের গর্জনে নিত্য ঘুম ভাঙা ভোরের আলোতে প্রতিটি মানুষ নিজেকে উপস্থাপন করে প্রকৃতির বিশালতায়। সাগর-নদী, খাল-বিল, আর অনাবিল সবুজবীথির চাকচিক্যতাকে সাথে নিয়ে সকলের সাধারণ জীবন-যাপন। টিনের চালে টুপটুপ বৃষ্টি কিংবা শিশিরের প্রতিটি ফোটা এখনকার মানুষদের প্রধান তৃপ্তির খোরাক।
হাতিয়া উপজেলা বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড হতে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ। নোয়াখালী জেলা হতে দক্ষিণে ২০ কিলোমিটার উত্তাল মেঘনার বুক পাড়িয়ে দিয়ে যেতে হয় এই দ্বীপে । বঙ্গোপসাগরের বুক ছিঁড়ে ভেসে ওঠা এ দ্বীপে এখনো লেগে আছে অনুন্নত ছোঁয়া। নদী ভাঙন রোধে ব্লক নির্মাণ, চিকিৎসা শাস্ত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান , শিল্পায়ন, সড়কপথ, নৌপথ, কিংবা সচ্ছল যাতায়াত ব্যবস্থা, কোনটাই যেন এখানকার মানুষদের ভাগ্যরেখার মধ্যে নেই। নির্বাচনের আগে সকলে কেবল স্বপ্ন দেখিয়ে যায়, সকলে বলে যায় হাতিয়ার রূপরেখা পরিবর্তনের অঙ্গিকার সমূহ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কবে আসবে হাতিয়ার উন্নয়ন ? আর কে হবে সে উন্নয়নের কারিগর ।
বিগত সময় কিংবা বর্তমান সময়েও হাতিয়ার জন্য এক ভয়ানক অভিশাপ হচ্ছে নদীভাঙন। প্রতি বছর বসতভিটা হারাচ্ছেন গরীব-অসহায় ও মেহনতী মানুষজন। হাজার-হাজার মানুষ সর্বত্র হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে দিন কাটাচ্ছে নানা বিষাদে জর্জরিত হয়ে। কিন্তু সরকারি ভাবে কোনো উদ্বেগ নেয়া হয়নি। সাধারণ মানুষ ও সেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো বারবার মানববন্ধন , মিছিল-মিটিং এবং জোরালো অনুরোধ করেও সরকারের কোনো উল্লেখযোগ্য সাড়া পায়নি।
অথচ হাতিয়া উপজেলার পশ্চিমে মনপুরা উপজেলা নদী ভাঙনের কবলে থাকলেও বর্তমানে ব্লক নির্মাণের কারণে সকল শঙ্কা কেটে ওঠেছে, ফলে তৈরি হচ্ছে নতুন ভূমি, নতুন আশা। একই সাথে ভোলা, লক্ষ্মীপুর জেলার অন্তর্গত আলেকজান্ডার এবং চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত সন্দীপ উপজেলাও ব্লকসহ নানা উন্নয়নের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে হাতিয়া অনুন্নত হওয়ার দোষ কার ? সরকারের নাকি জনপ্রতিনিধির ?
হাতিয়াকে যদি সঠিক ভাবে পরিচর্যা করা যায় এবং কাজে লাগানো যায় তাহলে হাতিয়া হয়ে উঠবে বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন এলাকা। ফলে অর্থনৈতিক ভাবে হাতিয়া আরো সচ্ছল হবে । হাতিয়াকে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ করার জন্য প্রয়োজন ভালো মন-মানসিকতা ; যেটা বিগত সময়ে কারো ছিলো না। যদি পর্যটন কেন্দ্র রূপান্তর করার লক্ষ্য থাকতো তাহলে হাতিয়া এতোকাল অনুন্নত হয়ে থাকতো না। পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটক ভ্রমণের মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে যাতায়াত ব্যবস্থা । হাতিয়ার মেইন সড়ক যেন একটি ভয়ানক ধ্বংসাত্মক এলাকা। রাশিয়া- ইউক্রেন সংঘর্ষে যেইসব বোমায় রাস্তায় গর্ত তৈরি হয়, তারচেয়েও বেশী গর্ত এবং বেহাল দশায় এইসব রাস্তাঘাট । হাতিয়ার সড়কপথের এইসব বেহাল দশার কারণে অধিকাংশ পর্যটক মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। চিতা হরিণ, কেওড়াবন, মনোমুগ্ধকর সমুদ্র তীর, সবুজের সমারোহসহ প্রকৃতির বিশালতার উপমা ছড়িয়ে আছে হাতিয়া দ্বীপে। তবুও কেনো পরিচর্যা হচ্ছে না ? বড় আফসোস হচ্ছে নিঝুমদ্বীকে নিয়ে। নিঝুমদ্বীপ বাংলাদেশের অন্যতম একটি পর্যটন এলাকা, যেটার সৌন্দর্য সকলকে ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা হওয়ার পরেও এতো অবহেলিত হয়ে আছে কেনো ? এর দায় কে নিবে ?
হাতিয়া উপজেলার অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে চিকিৎসা সেবা নিয়ে। সাড়ে ৭ লক্ষ্য মানুষের জন্য একটি মাত্র ‘৫০ শয্যা বিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স । এরমধ্যে রয়েছে নানা পুকুরচুরির ঘটনাও। নার্স সঙ্কট, পুরনো আসবাবপত্র , রোগীদের থাকার যায়গায়র সমস্যা , প্রয়োজনীয় ডাক্তারের অভাব, পরীক্ষা- নিরীক্ষা করার জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবসহ নানান জটিলতাশ জর্জরিত এই উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি। অথচ সেদিকে কারো কোনো খেয়াল নেই।
হাতিয়ার উন্নয়নের রূপরেখা পরিবর্তনের লক্ষ্যে এবং হাতিয়াকে আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে একজন সুদক্ষ কারিগরের প্রয়োজন। চায়ের লোভে পড়ে কিংবা সন্ত্রাসী আধিপত্য বিস্তার না করে একজন সুদক্ষ, সৎ এব মেধাবী ব্যক্তিকে যেন নির্বাচিত করে।
তবে ধারণা করা হচ্ছে হাতিয়া উপজেলার মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে ২৪ গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম যোদ্ধা হাতিয়া উপজেলার কৃতি সন্তান আব্দুল হান্নান মাসুদ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হওয়ার পর আব্দুল হান্নান মাসুদ হাতিয়ার জন্য যে অবদান রেখেছে তা সত্যিই মনোমুগ্ধকর এবং অভাবনীয় । হাতিয়ার তীরবর্তী অঞ্চলে সাগর হতে জেগে ওঠা চরসমুহে হাতিয়াকে রাজতন্ত্র করে রাখা মোহাম্মদ আলীর নেতাকর্মীরা ভোগের বস্তু বানিয়ে উল্লাস করেছে। গণঅভ্যুত্থানের পরপরই আব্দুল হান্নান মাসুদ এর অন্যতম ভূমিকা ছিলো এইসব চরকে যারা নথিপত্র করেছিলো, তাদেরকে বুঝিয়ে দেয়া। আব্দুল হান্নান মাসুদকে ভূমিহীনদের বন্ধুও বলা হয়৷ মানুষের ধারণা, আব্দুল হান্নান মাসুদ না হলে হয়তো এই চরগুলো কখনোই তারা ফিরে পেতো না । হাতিয়ার নদীভাঙন রোধে সাবেক এমপি প্রকৌশলী ফজলুল আজীম সাহেব এর পরে
বিগত সময়ে আর কারো তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা না থাকলেও আব্দুল হান্নান মাসুদ নদীভাঙন রোধে দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা রেখেছে। ভাঙন কবলিত এলাকায় জিও ব্যাগ দেয়ার কারণে নদীভাঙন অনেকটা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে । বিশেষ করে থানারহাট, আলামিন বাজার, ইসলামবাজার, ব্যারাকের কোনা , ভূমিহীন বাজার, নলেরচর,চেয়ারম্যান ঘাট, নলচিরা ঘাট, টাংকির ঘাট,
তুফানিয়া গ্রাম, চরচেঙ্গা ( কিছুদিন পর কাজ শুরু হবে), পইকবান্দা। (২/৩ দিন পর কাজ শুরু হবে)
বাংলাবাজার,চরঈশ্বরসহ মুক্তারিয়া ঘাটে ভাঙন কবলিত এলাকায় জিও ব্যাগের মাধ্যমে প্রতিরোধ করা হয়েছে। এই অসম্ভব একমাত্র সম্ভব হয়েছে আব্দুল হান্নান মাসুদ এর কারণে।
এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকলে হাতিয়ার রূপরেখা অতি দ্রুত পরিবর্তন হবে। এই পরিবর্তনের বিপ্লব আনার জন দ্বীপের মানুষদেরকে অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে, একান্ত আগ্রহ রাখতে হবে এবং নিজেদের উন্নয়নের গতিশীল বৃদ্ধি করতে দ্বীপ গঠনের সঠিক কারিগরকে বেঁচে নিতে হবে। তবেই হাতিয়ার রূপরেখা পরিবর্তন হবে।
এম এ জিন্নাহ
আপনার মতামত লিখুন :