
বাল্যবিবাহ নামটার সঙ্গে শৈশব-কৈশোরের একটা সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সামাজিক সমস্যাগুলোর মধ্যে বাল্যবিবাহ অন্যতম একটি। আমাদের দেশে বাল্যবিবাহ এখনও গভীর সামাজিক সংকটের নাম। আইনগত কাঠামো, সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার নানামুখী উদ্যোগ এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম থাকা সত্ত্বেও সামগ্রিক চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। বর্তমানে বছরে মাত্র ২ শতাংশ হারে বাল্যবিবাহ কমছে, যা বর্তমান গতিতে চললে এই প্রথা বন্ধ হতে দুই শতাব্দীরও বেশি সময় লাগবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একসময় বাল্যবিবাহ বাংলাদেশে মহামারি আকার ধারণ করেছিল ।
এখনো যে বাল্যবিবাহ হয় না, তা নয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেয়েদের জন্য এই শব্দটা বিভীষিকাময় এক কালো অধ্যায়। অনেকে বলেন, এটি একটি সামাজিক অভিশাপ, কিন্তু সংশ্লিষ্ট অভিভাবকরা এটি সামাজিক বাস্তবতা বলে অভিহিত করে থাকেন। বাল্যবিবাহের যেসব কারণ রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দরিদ্রতা, অশিক্ষা, সচেতনতার অভাব, প্রচলিত প্রথা ও কুসংস্কার, সামাজিক অস্থিরতা, যৌন নিপীড়ন, মেয়েশিশুর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, নিরাপত্তার অভাব, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, যৌতুক প্রথা এবং বাল্যবিবাহ রোধ-সংক্রান্ত আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া। বাল্যবিবাহের কারণে অপরিণত বয়সে সন্তান ধারণ, মাতৃমৃত্যুর হার বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যহানি, তালাক, পতিতাবৃত্তি, অপরিপক্ব সন্তান প্রসবসহ নানাবিধ জটিলতার শিকার হচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, আমাদের দেশে বেশির ভাগ মেয়ের বিয়ে হয় ১২ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে।
বিয়ের ১৩ মাসের মধ্যেই ৬৫ শতাংশ মেয়ে সন্তান ধারণ করে। গ্রামের মেয়েদের বেশির ভাগই বিয়ের এক বছরের মধ্যে সন্তান জন্ম দেয়। বাল্যবিবাহের প্রবণতা ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। বাল্যবিবাহের ফলে মেয়েদের অপরিণত বয়সে গর্ভধারণ করতে হয়। এমনকি গর্ভধারণ থেকে বাচ্চা প্রসব করতেই অনেকের মৃত্যু হয়। প্রতিদিনের খবরের কাগজে চোখ বুলালে এ রকম হাজারও ঘটনা চোখে পড়ে। এই বাল্যবিবাহ মেয়েদের জন্য কী ক্ষতি করে, তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। বাল্যবিবাহের শিকার ভুক্তভোগী ছেলেমেয়ে বুঝে হোক বা না বুঝে হোক, সে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাস্তবতার নিরিখে এটা মেনে নিতে বাধ্য হয়। পরবর্তী নেতিবাচক ফলাফল সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই থাকে না।
১৯২৯ সালের বাল্যবিবাহ আইন ২০১৭ সালে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে রূপান্তরিত হয়। ২০১৭ সালে বাল্যবিবাহ আইন সংশোধন করা হলেও এখনো গ্রামগঞ্জে-মফস্বল এলাকাসহ সারা দেশে বাল্যবিবাহ হচ্ছে অহরহ। এ আইনে বাল্যবিবাহের সংজ্ঞায় ছেলেমেয়ের বিয়ের বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত বয়সের নিচে পক্ষদ্বয়ের যেকোনো একজন হলেই সেটি বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য । কাজেই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কেবল আইন যথেষ্ট নয়। পরিবারের মানসিকতা না বদলালে, সমাজে কন্যাসন্তানের মর্যাদা না বাড়ালে এবং রাষ্ট্র যদি নিরাপত্তা ও শিক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে কোনো উদ্যোগই টেকসই ফল দেবে না। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র-এই তিন পক্ষ সক্রিয়ভাবে যুক্ত না হলে বাল্যবিবাহ নির্মূল সম্ভব নয়। মেয়েদের শিক্ষায়, স্বাস্থ্যসেবায় ও ক্ষমতায়নে বিনিয়োগই দেশের প্রকৃত উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে।
আপনার মতামত লিখুন :