
রোহান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের বস্তিতে থাকে। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে সে বাবাকে হারিয়েছে। অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়ে মোমেনা খাতুন খুব অসহায় হয়ে পড়েন। তেমন লেখাপড়াও করেননি। নইলে ছোটোখাটো একটা চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারতেন। নিরুপায় হয়ে মানুষের বাসায় বাসায় বুয়ার কাজ নিয়েছেন। যে টাকা পান তা দিয়ে বস্তির ছোট্ট কক্ষটির ভাড়া পরিশোধ করে ছেলের মুখে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত তুলে দিতেই রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন।
মাত্র ছয় বছর বয়স, যেসময় রোহানের স্কুলে যাবার কথা ছিল সেসময় মায়ের হঠাৎ অসুস্থতার কারণে আর ভর্তি করা হলো না। মাকে মানুষের বাসায় বাসায় কাজ করতে দেখে রোহানও রোজ বস্তির অন্য ছেলেদের সাথে পরিত্যক্ত জিনিসপত্র খুঁজতে বেরিয়ে যায়। রোহান তার বাবার মতো হয়েছে। খুব আড্ডা প্রিয় ছেলে। রেললাইনের আশপাশের সমবয়সী বন্ধু পেলে অমনি খেলায় মেতে ওঠে ও। প্রতিদিন সকাল সকাল বের হয়ে যায়। কোনোদিন ওর বের হতে দেরি হলে বন্ধুরা বাসায় এসে ডেকে নিয়ে যায়।
আজও তার ব্যতিক্রম হলো না। সিরাজ, বিমলরা রোহানদের ঘরের সামনে এসে এদিকওদিক পায়চারি করছে। রোহানের বের হবার কোনো আলামত না পেয়ে সিরাজ বিমলকে উদ্দেশ্য করে বলল, – কিরে বিমল! রোহাইননা আইজ এতো দেরি করের কিল্লাই? এতক্কণে হেতার তো ঘর তুন বাইর অইবার কথা আছিলো। আঁর মনে হয় হেতে কোনো সমস্যাত হোইড়ছে? – হেতের আবার কিয়ের সমস্যা? কাইলগা তো হেতে আঙগো লগে হারাদিন আছিলো। তোই আঁর মনে অয় হেতের মা’র কিছু অইছে। চল, আমরা হেতাগো ঘরে যাই।
– ঠিক আছে ,চল।
সিরাজ ও বিমল রোহানদের ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলো। রোহানকে তার মায়ের মাথায় পানি ঢালতে দেখে সিরাজ বলল, – কিরে রোহাইননা, খালার আবার কী অইছে? রোহান মাকে ধরে চৌকিতে বসিয়ে মায়ের মাথার পানি মুছতে মুছতে বলল, – কালইগা রাইতের তুন আঁর মা’র শরীলটা বেশি খারাপ অই গেছে। খুব মাথাব্যথা উঠছিলো। গাত জ্বরও আছে। ডাক্তার আনন দরকার। কিন্তু———। – এতো চিন্তা করোস কিল্লায়। চল আমরা যাই আব্দুল ডাক্তারেরে লই আয়? – না, দোস্ত, আব্দুল ডাক্তারেরে বাসায় আইতো কইলে আইতো নো। কারণ হেমিয়া এর আগের মেলা টিয়া হাইবো।
– হিয়ারহরও খালার অবস্থার কথা হুইনলে চলি আইবো। হেমিয়া খুব ভালা মানুষ। – হ্যাঁ, তুই ঠিক কথা কইছস। চল, ডাক্তারের দোয়ানের মুই যাই। – চল বন্ধু। রোহান মাকে আবার খাটের ওপর আলতোভাবে শুইয়ে রেখে ডাক্তারের চেম্বারের দিকে চলে আসে। আব্দুল ডাক্তারের চেম্বারটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে অবস্থিত। আব্দুল ডাক্তার খুব দেশপ্রেমিক মানুষ। রোহান, সিরাজ ও বিমল দোকানে এসে ডাক্তারের চেয়ারটা ফাঁকা দেখে এদিকওদিক তাকায়। বিমল রোহান ও সিরাজকে থামিয়ে বলল, – ডাক্তার কাগু তো দোয়ানে নাই।
রোহান আগ বাড়িয়ে বলল, – সিরাজ দোয়ানের ভিতরে ঢুকি দেখ তো। ডাক্তার কাগু আছে কিনা।
সিরাজ দোকানঘরের ভেতরের রুমে ডাক্তারকে কয়েকজন লোকের সাথে কথা বলতে দেখে বলল,
– এই তোরা ভিততে আয়। ডাক্তার কাগু ইয়ানে আছে। হেতেনে কি যেন গোপন কথা কর।
রোহান, সিরাজ ও বিমল দোকানের ভেতরে ঢুকে কান পেতে শুনতে থাকে। আবদুল ডাক্তার তার সাথের চার-পাঁচজনকে উদ্দেশ্য করে বললেন, – তাহলে এই কথা। আগামিকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে আমরাও মিছিলে শরিক হবো। মায়ের মুখের ভাষার জন্য প্রয়োজনে জান দেবো। তবু পিছপা হবো না।
সবাই সমস্বরে বলে ওঠলো, আমরা পিছপা হবো না। ইনশাআল্লাহ।
এইকথা বলে দোকানের ভিতরের রুম থেকে সবাই বের হতে লাগলেন। আচানক রোহানদের দেখে আব্দুল ডাক্তার চোখ বড় বড় করে বললেন,
– তোমরা এখানে কী করছিলে?
রোহান বলল,
– কাগু, আঁর মা আবার অসুস্থ অই গেছে। আমনেরেকে নিতাম আইছি।
আব্দুল ডাক্তার ব্যস্ততার গলায় বললেন,
– তাহলে চল আর দেরি না করে আগে তোমার মাকে দেখে আসি।
– জ্বি, কাগু, চলেন।
আবদুল ডাক্তারকে সাথে নিয়ে রোহানরা বাসায় ফিরে আসে। ডাক্তার ভালোভাবে দেখে রোহানের মায়ের জন্য কিছু ওষুধ লিখে দিলেন।
রোহান মায়ের ওষুধ আনতে আবার ডাক্তারের সাথে দোকানের দিকে আসে।
ওষুধ হাতে নিয়ে সিরাজ ও বিমলের মুখের দিকে তাকিয়ে রোহান ভাবতে থাকে।
আব্দুল ডাক্তার রোহানের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বললেন,
– কি ব্যাপার, রোহান? দাঁড়িয়ে আছো কেন? ওষুধ নিয়ে আগে বাড়ি যাও। তোমার মাকে সময়মতো ওষুধগুলো খাইয়ে দিও। ইনশাল্লাহ খুব তাড়াতাড়ি তোমার মা সুস্থ হয়ে উঠবেন।
– কিন্তু কাগু, আঁর কাছে তো অনকা কোনো টিয়া-হয়সা নাই।
আব্দুল ডাক্তার একগাল হেসে বললেন,
– ওহ! এই কথা। এজন্য এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলে। যাও আগে মাকে বাঁচাও। তারপর হাতে টাকা এলে দিয়ে যেও।
রোহান জলজল চোখে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে সিরাজ ও বিমলকে সাথে নিয়ে আবার বাসার উদ্দেশ্যে এগুতে লাগল।
কিছু দূর গিয়ে রোহান বলল,
– দোস্ত, আব্দুল ডাক্তার খুব ভালা মানুষ। তই
তোরা কলা ভবনের সামনের মুই যা। আঁই আঁর মারে ওষুধ খাবায় দিই আইয়ের।
– ঠিক আছে, তুই যা। বেশি দেরি করিচ্ছা।
– আইচ্ছা।
এই কথা বলে রোহান বস্তির দিকে চলে আসে। এরপর ওষুধ খাইয়ে দিয়ে মায়ের মাথা টিপতে লাগলো। একটুপর মা ঘুমিয়ে পড়লে রোহান দরজাটা বাইরে থেকে আটকিয়ে কলা ভবনের দিকে চলে আসে।
ততক্ষণে বিকেল সাড়ে চারটা বেজে গেছে। রোহানকে আসতে দেখে সিরাজ ও বিমল এগিয়ে আসে। তিনজনে হাঁটতে হাঁটতে কলা ভবনের একেবারে দক্ষিণ পাশে এসে জড়ো হয়ে দাঁড়ালো। রোহান বলল,
– তোরা কি কিছু চিন্তাভাবনা কইরছোসনি?
– কিয়ের চিন্তাভাবনা?
– কাইলগা ছাত্রগো মিছিলে যাইবার ব্যাপারে।
– হিয়ানটা তো বড্ডারা কইরবো। আমরা তো ছোড মানুষ। টোগাই। আমরা আর হেতাগো মতো কিছু করইাম হারুম নি?
– না, তোর কথা আঁর তুন এক্কানাও ভালা লাগে ন। আমরা ছোড। আমরা টোগাই। ইয়ান ঠিক। কিন্তু এই দেশ তো আঙগো বেকের। আমরাও তো বাংলায় কথা কই। আঙগো মায়ের ভাষার সম্মান রাইখতে আঙগোও তো দায়িত্ব আছে।
– হিয়ানটা তো ছাত্রগো আন্দোলন। হিয়ানে আমরা যাই কি কিরুম?
– হুন, ছাত্ররা শুরু কইরবো। দেশের মানুষ হেতাগোরে সমর্থন কইরবো। দেখোসনো আব্দুল ডাক্তাররা মিছিলে যাইবার লায় মিটিং কইরছে। গতকাইল সন্ধ্যায় বাজারের দোয়ানে বেকের মুখেমুখে এই কথা ইয়ানই আছিলো। যেন্নে হোক আঙগো বাংলা ভাষার সম্মান ধরি রাইখতে অইবো।
বিমল বলল,
– অ্যারে রোহান, তুই ঠিক কথা কইছোস।
কাইলরাইত আঁর বাপেও আঁর মারে ভাষা আন্দোলনের ব্যাপারে কী যেন কইছিলো।
পাশ থেকে সিরাজ বলল,
– হেলে আমরা অহন কি কিরতাম হারি?
– হুন, কাইলকার মিছিলে যাইবার ব্যাপারে আমরা কারো লগে কোন কথা কইতাম ন। কেউ হুলি গেলে আঙগোরে আর যাইতো দিতো ন। হইতেকদিনের মতন কাইলকাও আমরা বস্তা লই বাইর অমু। যন ছাত্র গো মিছিল বাইর অইবো তন আমরাও হেতাগো মিছিলের ভিততে মিশি যামু।
– আইচ্ছা, ঠিক আছে। দোস্ত আইজগা আর ভালা লাগের না। চল আমরা ঘরের মুই চলি যাই।
– আঁর তুনও ভালা লাগের না। চল।
এরপর ওরা যে যার গন্তব্যে চলে যায়। রাত আটটার দিকে আবার তিনজন একত্রিত হয়ে হাঁটতে হাঁটতে আব্দুল ডাক্তারের দোকানের দিকে চলে আসে। আজও ডাক্তারের দোকানের সামনের রুমে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। সাটারও লাগানো। শুধু দরজাটায় একটু ফাঁক করা আছে। আশপাশের দোকানপাট প্রায় বন্ধ রয়েছে। সিরাজ ও বিমলকে সঙ্গে নিয়ে রোহান ডাক্তারের দোকানের ভিতরে ঢুকলো। আব্দুল ডাক্তারসহ আজ চার পাঁচজনের মতো লোক বসে বসে উদ্বিগ্ন হয়ে রেডিও শুনছেন। হঠাৎ রোহানদের দেখে মাথা গরম না করে চোখের ইশারায় বসতে বললেন আব্দুল ডাক্তার।
রোহানরা একটু পিছনের দিকে গিয়ে বসলো। রেডিওতে রাত আটটার খবর শুরু হয়েছে। সবাই গভীর মনযোগ দিয়ে খবর শুনছেন। খবর শেষে কিছু মুহূর্ত সবাই নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলো। এরপর আব্দুল ডাক্তার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,
– নিশ্চিত দেশটা একটা সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানিরা আমাদের ওপর অন্যায়ভাবে উর্দুকে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। দীর্ঘ এক মাসের যে কারফিউ জারি করেছে আগামিকাল তা ভঙ্গ করতে ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পাশ থেকে একজন বললেন,
– আচ্ছা ডাক্তার সাহেব সব ছাত্র কি এক কথায় আছে?
– আন্দোলনের প্রশ্নে সবাই এক আছে। কিন্তু কেউ কেউ এতো তাড়াতাড়ি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে প্রতিবাদের পক্ষে নেই।
– তাহলে তো ছাত্রদের আন্দোলন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
– আমারও তাই মনে হচ্ছে। আবার ভাবছি ছাত্রদের মেজরিটি আন্দোলনে নামলে অন্যরাও বসে থাকবে না। তারওপর মায়ের ভাষার মর্যাদার প্রশ্নে দেশের আপামর মানুষও এই আন্দোলনে শরিক হতে পারে।
এদিক থেকে তো এটি পজিটিভ মনে হচ্ছে।
– আমার কাছেও তাই মনে হচ্ছে।
এই কথা বলে রোহানদের দিকে তাকিয়ে আব্দুল ডাক্তার বললেন,
– রোহান, এতো রাতে তুমি আবার কি জন্য এসেছো?
– ডাক্তার কাগু, কাইলগার আন্দোলনের অবস্থা জাইনতে আমরা তিন বন্ধু বাইর অইছি। আঁর মনে অয় কাইলগার আন্দোলন সফল অইবো।
সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে রোহানের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
একটু থেমে রোহান আবার বলল,
– আমরা তিনজন হইতেকদিনের মতন আইজও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাইরোমুই মানুষের হালায় দইন্না জিনিসওগল টোগাই লয়ছিলাম। হেসমগা ছাত্রগোরে দেই। হেতাগো বিভিন্ন কামকাজ দেই। আঁর মনে অর হেতারা এতো সহজে ছাইড়তো ন।
আব্দুল ডাক্তার আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
– তোমরা কী আর কিছু জানো?
– হ্যাঁ, ডাক্তার কাগু আইজ হেতারা গোপনে বৈঠক কইছে। আমরা হুইনছি, কাইলগা বেনে এগারোটায় হেতারা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাষ্ট্রভাষার লায় মিছিল বাইর কইরবো। তবে ১০-১২জন করি করি মিছিল বাইর অইবো। একের পর এক মিছিল সামনের মুই আগাই যাইবো। য্যান পুলিশ মিছিলে কিছু কইরতো না হারে।
অনেকক্ষণ পর আব্দুল ডাক্তারের মুখে হাসি ফোটে ওঠে। এরপর আব্দুল ডাক্তার সবাইকে বললেন,
– তাহলে এই কথা আগামিকাল আমরাও ছাত্রদের মিছিলে শরিক হবো। এখন যে যার বাসায় চলে যান।
সবাই বিদায় নিয়ে চলে গেল।
রোহানরাও আস্তে আস্তে দোকান থেকে বের হয়ে চলে গেল।
১৯৫২ সাল। ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল দশটা পঁয়তাল্লিশ মিনিট। রোহান, সিরাজ ও বিমল রেললাইনে এসে একত্রিত হয়। কথা বলতে বলতে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের দিকে চলে আসে। হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতর থেকে একের পর এক মিছিল বের হতে থাকে। তারা ফুটপাতের একপাশে দাঁড়িয়ে লক্ষ করে। রোহানরা নিজেদের কাঁধের বস্তা ফেলে একদৌড়ে একটা মিছিলে মিশে যায়। দেখতে দেখতে মিছিল জনস্রোতে পরিণত হতে থাকে। এরিমধ্যে মিছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে এলে পুলিশরাও শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই জনস্রোত ঠেকাতে পুলিশ ছাত্রদের লাঠিপেটা করতে শুরু করে, সঙ্গে চলে টিয়ার গ্যাসের শেল বর্ষণ।
প্রত্যেক মিছিল থেকে এক দুইজন করে ধরে নিয়ে আগ থেকে রাখা পাশের ট্রাকে উঠিয়ে নিচ্ছে। একসময় মিছিল এত বড় হয় যে পুলিশরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। রোহান মিছিল করতে করতে মিছিলের অনেক সামনে চলে যায়। সিরাজ বিমলরাও মিছিল করছে। এরিমধ্যে পুলিশ অতর্কিতে মিছিলে গুলিবর্ষণ শুরু করে। মুহূর্তে রফিক, জব্বার, বরকত সহ নাম না জানা অনেকেই নিহত হয়। বিমল আর সিরাজ কোনমতে দৌড়ে পালিয়ে যায়।
শহীদদের বুকের তাজা রক্তে ঢাকার পিচঢালা রাজপথ রঞ্জিত হয়ে ওঠে। শোকাবহ এ ঘটনার অভিঘাতে সমগ্র পূর্ব বাংলায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ২১ ফেব্রুয়ারির ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশে বিদ্রোহের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে।
রোহানের মা সারাদিন ছেলের আসবার পথ চেয়ে বসে আছেন। দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা নামে। কিন্তু রোহানের কোন দেখা নেই। রাত আটটা পার হয়। মনটাও আজ কেমন যেন করছে। সেই সকাল থেকে সারাক্ষণ ছটফট ছটফট করছে। তবে কি আমার রোহানের কিছু হলো। এই দুশ্চিন্তায় অনেক কষ্টে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসেন মোমেনা খাতুন। পাশের বাসাটাই সিরাজদের বাসা। সিরাজের মাকে দেখে বললেন,
– ভাবি, সিরাজ কোনায়? হেতে ঘরে আইছেনি? আঙগো রোহান অনও তো ঘরে আইয়ে ন। আঁর খালি ডর লাগের। দেশের অবস্থাও ভালা ন।
সিরাজের মা সিরাজের নাম ধরে ডাক দিতেই সে রোহানের মায়ের সামনে এসে দাঁড়ায়।
রোহানের মা ব্যাকূল হয়ে বললেন,
– বাবা, সিরাজ, আঁর রোহানেরে তুই দেইখছোনি? হেতে বেনে যে বাইর অইছে এবো ঘরে আইয়ে ন।
সিরাজ মাথানিচু করে নির্বাক দাঁড়িয়ে আছে।
– কি অইছে বাবা, তুই কথা ক না কিল্লাই? আঁর রোহানের কি কিছু অইছেনি?
সিরাজ কাঁদো গলায় বলল,
– খালা, আইজগা বেনে আঁই, বিমল আর রোহান এক লগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুই যাইবার সময় মিছিল
দেই মিছিল ঢুকি গেছি। আমরাও ছাত্রগো লগে মিছিল কইছি। কতক্ষণ হর মিছিলে রোহানেরে না দেই আমরা দোনোজন খাড়ায় গেছি। হরে হেতারে দেই মিছিলের এক্কারে সামনের মুই হেতে মিছিল কইছে।
হিচের তুন আমরা হেতারে চিল্লাই চিল্লাই ডাইকছি। কিন্তু মিছিলের আবাজের লায় হেতে আঙগো ডাক হুনে ন। হঠাৎ পুলিশ মিছিলে গুলি করা শুরু করে। হরে আমরা দোনোজন কোনমতে মিছিলের তুন ধায় আইছি। হিয়ার হরে আমরা আবার যাই হেতেরে টোগাইছি। কিন্তু হাই ন। হুইনছি পুলিশের গুলিতে মেলা মানুষ মরি গেছে। রাস্তাত মেলা রক্ত জমি রইছে।
এই কথা বলে সিরাজ হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। মুহূর্তে রোহানের মায়ের আহাজারিতে আশপাশের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। এরইমধ্যে কয়েক দফায় তিনি হুঁশ হারিয়ে ফেলেন। এরপর হুঁশ ফিরে এলে সিরাজের মা আর সিরাজকে সঙ্গে নিয়ে সন্তানের খোঁজে বের হলেন মোমেনা খাতুন।
আপনার মতামত লিখুন :