
রমজান মাসে দীর্ঘ সময় উপবাস থাকার ফলে শরীরের জৈবিক ঘড়িতে পরিবর্তন ঘটে। খাদ্যাভ্যাস, ঘুম ও দৈনন্দিন রুটিন বদলে যাওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শারীরিক ভারসাম্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ ও গাউটে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা জরুরি।
রমজান শুরুর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা, ওষুধের ডোজ সমন্বয় করা এবং জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক প্রস্তুতি নিলে অধিকাংশ রোগীই নিরাপদে রোজা পালন করতে পারেন।
ডায়াবেটিস ও ইনসুলিন ব্যবস্থাপনা
রমজানে ডায়াবেটিক রোগীদের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো **হাইপোগ্লাইসেমিয়া** (রক্তে শর্করা হঠাৎ কমে যাওয়া)।
ওষুধ ব্যবস্থাপনা
* মেটফরমিন সাধারণত একই ডোজে চালানো যায়।
* সালফোনাইলইউরিয়া জাতীয় ওষুধ ব্যবহারে সতর্কতা প্রয়োজন।
* গ্লাইবেনক্লামাইড এড়িয়ে গ্লিক্লাজাইড বা ডিপিপি-৪ ইনহিবিটরজাতীয় ওষুধ তুলনামূলক নিরাপদ।
ইনসুলিন
* সাহ্রির সময় ইনসুলিনের ডোজ কিছুটা কমাতে হতে পারে (চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী)।
* দিনে গ্লুকোমিটার দিয়ে রক্তে শর্করা পরীক্ষা করলে রোজা নষ্ট হয় না।
* রক্তে শর্করা ৩.৯ এমএমওএল/এলের নিচে নামলে অবিলম্বে রোজা ভেঙে শর্করাজাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে।
উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগ
রমজানে অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ, ভাজাপোড়া ও অনিদ্রার কারণে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে।
* ওষুধ ইফতার ও সাহ্রিতে নির্দিষ্ট সময়ে গ্রহণ করুন।
* অতিরিক্ত লবণযুক্ত ও প্রসেসড খাবার (চিপস, সস, আচার) পরিহার করুন।
* হার্ট ফেইলিউর বা জটিল হৃদ্রোগ থাকলে পানি গ্রহণের পরিমাণ চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ঠিক করুন।
কিডনির রোগ
পানি কম পান করার কারণে রক্তে ক্রিয়েটিনিন ও পটাশিয়ামের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষ সতর্কতা:
যাঁদের কিডনি রোগের স্টেজ ৩ বা তার বেশি, তাঁদের জন্য রোজা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
গাউট
রমজানে ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
* ইফতারে অতিরিক্ত ডাল বা ছোলা না খেয়ে সবজি ও মাছকে প্রাধান্য দিন।
* ব্যথার ওষুধ ইফতারের পর ভরা পেটে ও গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের সঙ্গে সেবন করুন।
পরিপাকতন্ত্র ও পানিবাহিত রোগ
রমজানে ডায়রিয়া, আমাশয়, হেপাটাইটিস ও টাইফয়েডের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
* খোলা বা রাস্তার খাবার এড়িয়ে চলুন।
* অপরিষ্কার বরফ ও বারবার গরম করা খাবার পরিহার করুন।
* ইফতারে একবারে বেশি না খেয়ে ধাপে ধাপে খাবার গ্রহণ করুন।
* পাতলা পায়খানা শুরু হলে দ্রুত ওআরএস পান করুন।
ব্যায়াম ও জীবনযাপন
* রোজা অবস্থায় ভারী ব্যায়াম ও কায়িক পরিশ্রম এড়িয়ে চলুন।
* ইফতারের ১–২ ঘণ্টা পর হালকা হাঁটাহাঁটি করা যেতে পারে।
* হাঁটুর ব্যথা থাকলে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে তারাবিহ পড়ার পরিবর্তে প্রয়োজনে বসে নামাজ আদায় করুন।
* তারাবিহর নামাজও হালকা শারীরিক ব্যায়ামের মতো উপকারী।
কখন রোজা ভাঙবেন (জরুরি সতর্কতা)
নিম্নোক্ত লক্ষণ দেখা দিলে রোজা অব্যাহত রাখা উচিত নয়—
* অতিরিক্ত দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
* প্রস্রাব কমে যাওয়া বা গাঢ় রঙ ধারণ করা
* বুক ধড়ফড় বা তীব্র শ্বাসকষ্ট
* রক্তে শর্করা ৩.৯ এমএমওএল/এলের নিচে বা ১৬.৭ এমএমওএল/এলের ওপরে ওঠা
রমজান ইবাদতের মাস। সুস্থ শরীরেই ইবাদত পরিপূর্ণ হয়। তাই সচেতন থাকুন, নিয়ম মেনে চলুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপদে রোজা পালন করুন।
অধ্যাপক ডা. মো. টিটু মিয়া
মেডিসিন ও রিউমাটোলজি বিশেষজ্ঞ
সাবেক অধ্যক্ষ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
আপনার মতামত লিখুন :