
মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার : নোয়াখালীতে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের জমি যেন ‘উচ্ছেদ-দখল’ চক্রের অন্তহীন ফাঁদে আটকে পড়েছে। দিনে প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযান, আর রাত পোহানোর আগেই একই জমি চলে যাচ্ছে প্রভাবশালীদের দখলে—এমন অভিযোগ এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে। ফলে সরকারি জমি রক্ষায় সওজের সক্ষমতা, নজরদারি ও প্রশাসনিক কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সোনাইমুড়ী-রামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ চলমান থাকলেও প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা জমি দখলমুক্ত রাখা যাচ্ছে না। উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও স্থায়ী সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় একদিকে সরকারি জমি উদ্ধার হচ্ছে, অন্যদিকে রাতের আঁধারে তা আবারও বেদখল হয়ে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) গভীর রাতে সোনাইমুড়ী বাজারসংলগ্ন শিমুলিয়া এলাকায় সওজের প্রায় ৩০০ ফুট জমি নতুন করে দখল করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক জানান, রাত ১২টা থেকে ভোর ৩টা পর্যন্ত প্রায় ৫০ জন শ্রমিককে এক হাজার টাকা করে মজুরি দিয়ে টিনের বেড়া নির্মাণের কাজ করানো হয়। তার দাবি, স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার নেতৃত্বে এ দখল কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এ সময় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে পাহারায় ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার মানববন্ধন করেন সোনাইমুড়ী পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা ইসমাইল মোল্লা, শিমুলিয়া ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহ-সভাপতি ডা. শহীদ উল্লাহ, ব্যবসায়ী নোমানসহ স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, সরকারি জমি দখলে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করা হচ্ছে।
মানববন্ধনের পর স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্দেশে প্রশাসন অভিযান চালিয়ে ওই অংশের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—উচ্ছেদের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যদি একই জমি আবার দখল হয়ে যায়, তাহলে অভিযানের কার্যকারিতা কোথায়?
সরেজমিনে দেখা যায়, নোয়াখালী-ঢাকা মহাসড়কের সোনাইমুড়ী ইসলামগঞ্জ বাজার এলাকায় প্রায় ৫০০ মিটার সওজের জমি অবৈধভাবে দখল করে দোকানপাট নির্মাণ করা হয়েছে। বারাহিনগর গ্রামের প্রবেশমুখ থেকে কাতার মসজিদ পর্যন্ত মহাসড়কের পাশের বিস্তীর্ণ সরকারি জমিও বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দখলে রয়েছে।
এদিকে বজরা বাজারে উদয়ন সমিতির নামে বনায়নের শর্তে লিজ নেওয়া প্রায় দেড়শ মিটার জায়গায় টিনশেড ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। সমিতির উপদেষ্টা নূর আলম জানান, অ্যাপ্রোচ রোড ও বনায়নের উদ্দেশ্যে ৩০ বছরের জন্য লিজ নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে তাদের খাজনা বকেয়া রয়েছে।
সোনাইমুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দক্ষিণ পাশেও মহাসড়কসংলগ্ন প্রায় ৩০০ ফুট সরকারি জমি দখল করে হোটেল ও দোকান গড়ে তোলা হয়েছে। দখলদারদের একজন মামুন দাবি করেন, আগে এসব দোকান বৈধ লিজের আওতায় ছিল, তবে বর্তমানে লিজ নবায়ন হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু শিমুলিয়া বা ইসলামগঞ্জ নয়; বজরা থেকে চাষীরহাট পর্যন্ত মহাসড়কের দুই পাশের বিপুল পরিমাণ সওজের জমি দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালীদের দখলে রয়েছে। অথচ এসব স্থাপনার অধিকাংশের বিরুদ্ধেই দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত দুই-তিন বছর ধরে সওজের লিজ নবায়ন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে সরকার যেমন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি মূল্যবান সরকারি জমি একের পর এক অবৈধ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে।জমিতে ফের পুনর্দখলের অভিযোগ; দুই-তিন বছর ধরে লিজ নবায়ন বন্ধ, হারাচ্ছে সরকার রাজস্ব—প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন চার লেন প্রকল্পের অধিগ্রহণ করা
২০২৪ সালের ২৮ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় বেগমগঞ্জ-সোনাইমুড়ী-রামগঞ্জ চার লেন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মেয়াদি এ প্রকল্পের আওতায় সড়ক প্রশস্তকরণ, শক্তিশালীকরণ, ফুটপাত ও ড্রেন নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজ বাস্তবায়িত হচ্ছে।
এ বিষয়ে নোয়াখালী সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফরিদ উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পরে সওজের সোনাইমুড়ী সড়ক শাখার উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আবদুর রহিম বলেন, “অবৈধ দখলদার উচ্ছেদে অভিযান চলমান রয়েছে। ভবিষ্যতে সরকারি জমি পুনর্দখল ঠেকাতে সীমানা পিলার স্থাপন করা হবে।
তবে ইসলামগঞ্জ বাজার থেকে পোরকরা পর্যন্ত দীর্ঘদিনের দখলদারদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
স্থানীয়দের মতে, বিচ্ছিন্নভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে সরকারি জমি রক্ষা সম্ভব নয়। স্থায়ী সীমানা নির্ধারণ, নিয়মিত নজরদারি এবং রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে সব অবৈধ দখলদারের বিরুদ্ধে সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে কোটি টাকার সরকারি সম্পদ দখলমুক্ত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
আপনার মতামত লিখুন :