
মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার :
সোনাইমুড়ী উপজেলা-তে কোরবানির পশুর হাটের সরকারি ইজারা মূল্য নির্ধারণ নিয়ে জনমনে ব্যাপক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের প্রকাশিত ২০২৬ সালের অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাট-বাজার ইজারা বিজ্ঞপ্তিতে কয়েকটি হাটের সরকারি দর নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ২৪৬ টাকা থেকে ৬০৬ টাকার মধ্যে। অথচ ইজারায় অংশ নিতে অফেরতযোগ্য সিডিউল মূল্যই রাখা হয়েছে ৫০০ টাকা।
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় সচেতন মহলে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। এলাকাবাসীর অভিযোগ, একটি গরু বিক্রির হাসিল থেকেই যেখানে কয়েকশ টাকা আদায় হয়, সেখানে পুরো পশুর হাটের সরকারি দর এত কম নির্ধারণ করা অস্বাভাবিক ও রহস্যজনক। এতে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে বলেও মনে করছেন তারা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আবদুল মালেক বলেন, একটা মাঝারি গরু বিক্রি হলেও কয়েকশ টাকা হাসিল নেওয়া হয়। সেখানে পুরো হাটের দর ২৪৬ টাকা হওয়া বিশ্বাস করার মতো না। এখানে নিশ্চয়ই কোনো গরমিল আছে। আরেক বাসিন্দা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দর নির্ধারণ হলে এত কম হওয়ার কথা না। এতে সিন্ডিকেট বা প্রভাবশালীদের সুবিধা করে দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটাও তদন্ত হওয়া দরকার।
সরকারের নির্ধারিত টোল চার্ট অনুযায়ী, কোরবানির হাটে একটি গরু বিক্রি হলেই সরকারি কোষাগারে অন্তত ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা জমা হওয়ার কথা। কিন্তু উপজেলা প্রশাসনের দরপত্র বিজ্ঞপ্তি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কয়েকটি পশুর হাটের সরকারি ইজারা মূল্যই নির্ধারণ করা হয়েছে একটি গরুর হাসিলের চেয়েও কম।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে ২২টি হাট-বাজার ইজারা দিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি হাটের সরকারি দর তিন সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ। সবচেয়ে কম দর ধরা হয়েছে সোনাপুর বাজার সংলগ্ন পশুর হাটে মাত্র ২৪৬ টাকা। এছাড়া আমিন বাজার ঈদগাহ সংলগ্ন হাট, ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা সংলগ্ন হাট এবং মোরশেদ আলম উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন হাটের সরকারি দর ধরা হয়েছে ৩৫২ টাকা করে। সাহারপাড় হনুফা বাজার সংলগ্ন হাটের দর ৫২২ টাকা, কালিকাপুর বাজার সংলগ্ন হাটের ৬০৩ টাকা এবং শান্তির হাটের সরকারি দর নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০৬ টাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি বিধিমালা অনুসারে বিগত তিন বছরের গড় সর্বোচ্চ দর এবং অতিরিক্ত ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি যোগ করে হাটের সরকারি মূল্য নির্ধারণ করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয়নি। বরং মনগড়া ও অস্বাভাবিকভাবে কম দর নির্ধারণ করা হয়েছে।
দরপত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছর মোরশেদ আলম উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন হাটের সরকারি দর ছিল ১ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ দর উঠেছিল ২ হাজার ২০ টাকা। বিধিমালা অনুযায়ী চলতি বছরে এ হাটের সরকারি দর হওয়ার কথা ছিল অন্তত ৭১৩ টাকা ৭৩ পয়সা। কিন্তু এবার দর ধরা হয়েছে মাত্র ৩৫২ টাকা। একইভাবে ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা সংলগ্ন হাটে গত বছর ১ হাজার ৪০০ টাকার বিপরীতে সর্বোচ্চ দর উঠেছিল ২ হাজার ২০ টাকা। অথচ এবার সেই হাটের সরকারি মূল্যও নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৩৫২ টাকা।উপজেলা পরিষদের গোপনীয় শাখার অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মামুন বলেন, সরকারি নিয়ম মেনেই দর নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো হাট ইজারা না হলে পরবর্তী বছর দর কমে যায়।
তিনি জানান, মোরশেদ আলম উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন হাটের আগের দুই বছর সরকারি খাস আদায় না হওয়ায় এবার দর কম নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ওই সময় কেন খাস আদায় হয়নি এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান। এ বিষয়ে নাটেশ্বর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কবির হোসেন খোকন বলেন, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে স্থানীয় নেতাকর্মীরা হাট পরিচালনা করেছেন। ২০২৫ সালে সরকারি ডাক হলেও হাট জমেনি।” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক সাংবাদিক দাবি করেন, আওয়ামী লীগ আমলে স্থানীয় প্রভাবশালীরা কোরবানির হাট পরিচালনা করলেও সেই আয় সরকারি খাতায় প্রতিফলিত হয়নি। ফলে সরকার প্রকৃত রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
হাট-বাজার দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ও উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন, এই মূল্য ওপর থেকে নির্ধারণ হয়ে আসে। বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলতে পারবেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাছরিন আকতার বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বিগত তিন বছরের সর্বোচ্চ দরের গড় হিসাব করে বর্তমান দর নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো হাট ইজারা না হলে খাস আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে হাট পরিচালিত হলেও সরকারি খাতায় আয় শূন্য দেখানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেসময় আমি এখানে কর্মরত ছিলাম না, তাই বিষয়টি সম্পর্কে আমার জানা নেই।
আপনার মতামত লিখুন :