• ঢাকা
  • রবিবার, ২৪শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২৩ মে, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ২৩ মে, ২০২৬

ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া: সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতাই রক্ষাকবচ – সেলিনা আক্তার

ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক কোনো সংকট নয়; এটি ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাম, শহর ও উপজেলা, দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে। ভোলার একটি হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের দৃশ্য যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। একই পরিবারের তিন সদস্য সেখানে চিকিৎসাধীন। শিশুর হাতে স্যালাইন, পাশে উৎকণ্ঠিত মা কখনো সন্তানের জ্বরের হিসাব রাখছেন, কখনো জানালার বাইরে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। পাশের বিছানায় নিস্তেজ শরীরে শুয়ে আছেন বাবা। এমন দৃশ্য এখন দেশের বহু হাসপাতালেই দেখা যাচ্ছে।

বর্তমানে এটি একটি বড়ো জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। যদিও ডেঙ্গুজ্বর সারাবছরই কমবেশি দেখা যায়, বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই এর বিস্তার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। সাধারণত জুন থেকে অক্টোবর সময়কে ডেঙ্গুর প্রধান মৌসুম ধরা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে এর মৌসুমি বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন এসেছে। এখন আগেভাগেই সংক্রমণ শুরু হচ্ছে এবং দীর্ঘ সময় ধরে তা স্থায়ী হচ্ছে।

চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু উভয় রোগই এডিস মশাবাহিত ভাইরাসজনিত সংক্রমণ। মূলত এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস অ্যালবোপিকটাস প্রজাতির মশার মাধ্যমে এসব ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। দিনের বেলায়, বিশেষ করে সকাল ও বিকেলের দিকে এডিস মশার সক্রিয়তা বেশি থাকে। কিন্তু এ তথ্য অনেকের অজানা হওয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে প্রতিনিয়ত। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় সাধারণত উচ্চ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও অস্থিসন্ধিতে যন্ত্রণা, বমি ও ত্বকে র‍্যাশ দেখা যায়। ডেঙ্গুতে সময়মতো চিকিৎসা না হলে প্লাজমা লিকেজ, রক্তক্ষরণ ও অঙ্গ বিকলের মতো জটিলতা হতে পারে, বিশেষ করে জ্বর কমার পরের ৪৮ ঘণ্টা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। অন্যদিকে চিকুনগুনিয়ার প্রধান সমস্যা হলো দীর্ঘস্থায়ী অস্থিসন্ধির ব্যথা, যা অনেক সময় মাসের পর মাস থাকে। শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা উভয় রোগেই বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
ডেঙ্গু আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষের উপসর্গ মৃদু থাকে বা অনেক সময় কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। সাধারণত সংক্রমিত মশার কামড়ের ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে উপসর্গ প্রকাশ পায় এবং ১ থেকে ২ সপ্তাহের মধ্যে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে রোগটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে হঠাৎ তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও অস্থিসন্ধিতে তীব্র যন্ত্রণা, বমি এবং ত্বকে র‍্যাশ। সময়মতো চিকিৎসা না হলে প্লাজমা লিকেজ, রক্তক্ষরণ ও অঙ্গ বিকলের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পরের ৪৮ ঘণ্টা রোগীর জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়।

চিকুনগুনিয়া রোগের উপসর্গও অনেকটা একই রকম হলেও এর প্রধান ভোগান্তি হলো দীর্ঘস্থায়ী অস্থিসন্ধির ব্যথা, যা অনেকের ক্ষেত্রে সপ্তাহ বা মাসজুড়ে স্থায়ী হতে পারে। শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা উভয় রোগেই বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। ডেঙ্গুর উপসর্গ অনেক সময় জিকা, ম্যালেরিয়া বা চিকুনগুনিয়ার সঙ্গে মিল থাকায় বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তাই নিশ্চিতভাবে রোগ শনাক্ত করতে ল্যাবরেটরি পরীক্ষাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।

চিকুনগুনিয়ায় অধিকাংশ মানুষ এক সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হলেও অনেকের জয়েন্টের ব্যথা সপ্তাহ বা মাসজুড়ে থাকতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ক্লান্তিও দেখা দেয়। রোগের প্রথম সপ্তাহে রক্ত পরীক্ষা করে সংক্রমণ শনাক্ত করা যায়, পরে অ্যান্টিবডি পরীক্ষার মাধ্যমে সাম্প্রতিক বা আগের সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়। বয়স্ক ব্যক্তি বিশেষ করে ৬৫ বছরের বেশি, শিশু, নবজাতক, গর্ভবতী নারী এবং উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে রোগের ঝুঁকি ও জটিলতা বেশি হতে পারে। তাই উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। চিকুনগুনিয়ার নির্দিষ্ট টিকা বা অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। বিশ্রাম, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ এবং প্যারাসিটামলজাতীয় ওষুধের মাধ্যমে উপসর্গ উপশম করা হয়।

বর্ষাকাল, জলবায়ু পরিবর্তন ও দ্রুত নগরায়ণ ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বাহক এডিস মশার বিস্তার বাড়ায়। বর্ষায় জমে থাকা পানি যেমন টায়ার, ডাবের খোসা, ফুলের টব, ছাদের পানি বা অব্যবহৃত পাত্র এডিস মশার প্রজননের আদর্শ স্থান। মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আর্দ্রতা ও বৃষ্টির কারণে রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘস্থায়ী বর্ষা, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধির কারণে মশার বংশবৃদ্ধি দ্রুত হচ্ছে এবং শীতকালেও ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। ২৫–৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও ৬০–৮০ শতাংশ আর্দ্রতা এডিস মশার জন্য সবচেয়ে অনুকূল পরিবেশ। এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলা, বিশেষ করে সকাল ও বিকেলে বেশি সক্রিয় থাকে। তাদের ডিম প্রতিকূল পরিবেশেও কয়েক মাস বেঁচে থাকতে পারে এবং পানি পেলেই দ্রুত লার্ভায় পরিণত হয়।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিক সচেতনতা ও আচরণ পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। এজন্য বছরব্যাপী সচেতনতামূলক কর্মসূচি, স্কুলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ শিক্ষা, গণমাধ্যমে প্রচার এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সারা দেশে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালু হয়েছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনও ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন প্রতি মাসের প্রথম শনিবার ‘ক্লিনিং ডে’ ঘোষণা করেছে এবং ৭৫টি ওয়ার্ডে এডিস লার্ভা জরিপ শুরু করেছে। পাশাপাশি ‘পরিচ্ছন্ন আঙিনা’ কর্মসূচির মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন জারি ও বাউল গানের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ সচেতনতামূলক প্রচার এবং নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত ও ধারাবাহিক বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে আসছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল ধ্বংসে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়ে আবাসিক এলাকা, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, ড্রেন, খালি প্লট ও বাজার এলাকায় বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে। এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে লার্ভিসাইড ছিটানো এবং প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণে ফগার মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে, যাতে ডেঙ্গুর বিস্তার দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।

জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে লিফলেট, পোস্টার ও ব্যানার বিতরণের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচারণা চালানো হচ্ছে। মানুষকে ঘরবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। স্কুলভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, আলোচনা সভা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে শিশু-কিশোরদের মধ্যেও স্বাস্থ্যসচেতনতা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
এছাড়া প্রতি শনিবার বড়ো পরিসরে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবক, সামাজিক সংগঠন ও সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণে এসব অভিযানে এলাকার ড্রেন, ছাদ, ফুলের টব, টায়ার ও পরিত্যক্ত পাত্র পরিষ্কার করা হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য শুধু সাময়িকভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে নাগরিক সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

এডিস মশার প্রজননের জন্য জমে থাকা পরিষ্কার পানি ও উষ্ণ-আর্দ্র পরিবেশ সবচেয়ে অনুকূল। ফুলের টব, টায়ার, ডাবের খোসা কিংবা এসির নিচে জমে থাকা পানি সহজেই মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘস্থায়ী বর্ষা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রা বৃদ্ধি এডিস মশার বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করছে। এ পরিস্থিতিতে চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। ঘরবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, কোথাও পানি জমতে না দেওয়া, মশারি ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত সচেতনতা বৃদ্ধি ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি।
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া আজ শুধু মৌসুমি রোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের বড় একটি অংশ হয়ে উঠেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নাগরিক অসচেতনতা এডিস মশার বিস্তারকে আরও সহজ করে তুলছে। তাই এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণও। নিজের ঘর, আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, কোথাও পানি জমতে না দেওয়া, নিয়মিত মশকনিধন কার্যক্রমে সহযোগিতা করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই হতে পারে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতার সমন্বিত চর্চাই পারে পরিবার, সমাজ ও দেশকে এই দুই রোগের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে।
লেখক: সহকারী তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর