• ঢাকা
  • রবিবার, ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

সোনাইমুড়ীতে গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু: হত্যা না আত্মহত্যা, মুখোমুখি দুই পরিবার

মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার
নোয়াখালী চারদিকে কান্নার রোল। উঠানে শত শত নারী-পুরুষের ঢল। সোনাইমুড়ী উপজেলার নদনা ইউনিয়নের শাকতলা গ্রামের মান্নান ড্রাইভারের বাড়িতে এখন শোকের মাতম। মাত্র ২৩ বছর বয়সে নিথর দেহে বাবার বাড়িতে ফিরেছেন সানজিদা সুলতানা সুমাইয়া।

সোমবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে সেনবাগে শ্বশুরবাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ বাড়িতে পৌঁছালে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সৃষ্টি হয়। পরিবারের দাবি, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তবে শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সানজিদা আত্মহত্যা করেছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, আড়াই বছর আগে পার্শ্ববর্তী সেনবাগ উপজেলার সালেহ উদ্দিনের (২৫) সঙ্গে প্রেমের টানে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সানজিদা। পরে উভয় পরিবার আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে। তাঁদের সংসারে মানহা নামে দেড় বছরের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। তবে গত দেড় মাস ধরে তাঁদের দাম্পত্য জীবনে কলহ চলছিল বলে নিহতের স্বজনরা জানিয়েছেন।

নিহতের বাবা মো. মহসিন অভিযোগ করেন, ঘটনার দিন দেবরের বিয়েতে না যাওয়াকে কেন্দ্র করে শ্বশুরবাড়ির লোকজন সানজিদাকে মারধর ও গালাগাল করেন। সানজিদা ফোনে বিষয়টি বাবাকে জানানোর কিছুক্ষণ পরই তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে যায়। পরে শ্বশুরবাড়ি থেকে খবর আসে—সানজিদা অসুস্থ। সেখানে গিয়ে তিনি মেয়েকে মেঝেতে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ একটি সাদা কাগজে তাঁর স্বাক্ষর নিতে চাপ প্রয়োগ করেছে। তবে পুলিশ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

আঘাতের চিহ্ন ও মায়ের প্রশ্ন

নিহতের মা সালমা আক্তার প্রশ্ন তুলে বলেন, “শ্বশুরবাড়ির লোকজন আত্মহত্যার কথা বললেও পুলিশ তো লাশ ঝুলন্ত অবস্থায় দেখেনি। আমার মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।”

মরদেহ গোসল করানো স্থানীয় নারীরা জানান, সানজিদার হাত, পিঠ, কাঁধ ও গলার বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন এবং জমাট রক্তের দাগ লক্ষ্য করা গেছে।

স্বামীর দাবি বনাম সরেজমিন চিত্র

মুঠোফোনে স্বামী সালেহ উদ্দিন জানান, পারিবারিক ঝগড়ার একপর্যায়ে সানজিদা নিজের কক্ষের দরজা বন্ধ করে দেন। পরে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে তাঁকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখে দরজা ভেঙে নামানো হয়। দ্রুত স্থানীয় সাফিয়া-সোবহান হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

তবে সরেজমিনে দেখা যায়, দরজায় আঘাতের চিহ্ন থাকলেও সিলিং ফ্যানের পাখাগুলো ছিল স্বাভাবিক। আত্মহত্যার উপকরণ হিসেবে যে ওড়নাটি দাবি করা হচ্ছে, তাতেও অসংগতি রয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।

সাফিয়া-সোবহান হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. শাহিন মোল্লা জানান, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে রোগীকে মৃত অবস্থায় আনা হয়। গলায় দাগ থাকায় এবং বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নোয়াখালী সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়।

সেনবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবুল বাশার বলেন, “আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ মেঝেতে শোয়ানো অবস্থায় পেয়েছি। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর জানা যাবে এটি হত্যা না আত্মহত্যা, এবং সে অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগটিকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।

বর্তমানে দেড় বছরের শিশুকন্যা মানহাকে নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, কারণ ঘটনার পর থেকে তাকে পাওয়া যাচ্ছে না। একদিকে স্বামীর কান্না, অন্যদিকে শরীরে আঘাতের চিহ্ন—সব মিলিয়ে সুমাইয়ার মৃত্যু এখন এক বড় রহস্যে পরিণত হয়েছে।

আরও পড়ুন

  • . এর আরও খবর