
মোহাম্মদ হানিফ, স্টাফ রিপোর্টার : এগিয়ে আসছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। রাজনৈতিক দলগুলো ব্যস্ত প্রচার-প্রচারনায় আর প্রশাসন নিরাপত্তা জোরদারে। নোয়াখালী-১ (চাটখিল-সোনাইমুড়ী আংশিক) আসনটির সোনাইমুড়ী অংশে ভোটকেন্দ্র রয়েছে ৬৯টি।
যেগুলোতে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারী দুই লাখ ১৮ হাজার ৫১১ ভোটারের নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে প্রশাসন।
ভোটকেন্দ্র গুলোতে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিতে পরিকল্পনা করেছে উপজেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ, অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, গুরুত্বপূর্ণ, অধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং সাধারণ মোট পাঁচ ভাগ করা হয়েছে কেন্দ্র গুলোকে। যার মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখানো হয়েছে ১৩টি, অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ১১টি, গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে একটি, অধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তিনটি ও সাধারণ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে ৪১টি কেন্দ্রকে।
প্রশাসনের তৈরী তালিকায় সোনাইমুড়ী থানা থেকে প্রতিটি কেন্দ্রের দুরত্ব নির্ণয় করা হয়েছে। যেখানে ১ থেকে ৪ কিলোমিটারের মধ্যে ২৬টি কেন্দ্র, পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে সাতটি, ৬-৭ কিলোমিটারের মধ্যে ১৪টি, ৮-৯ কিলোমিটারের মধ্যে ১২ টি, ১০ কিলোমিটারের মধ্যে আটটি কেন্দ্র এবং ১২ থেকে ১৪ কিলোমিটারের দূরত্বে রয়েছে দুইটি কেন্দ্র। এর মধ্যে সোনাইমুড়ী থানা থেকে সবচেয়ে দূরত্বে রয়েছে দেওটি ইউনিয়নের পতিশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ঘাসেরখিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের সাথেই রয়েছে কুমিল্লার সীমান্ত। যার মধ্যে সরাসরি কুমিল্লার সীমানা ঘেষে রয়েছে চাষীরহাট ইউনিয়ন। উপজেলার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জয়াগ ইউনিয়নটি রয়েছে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার সাথে যুক্ত। উত্তর-পূর্ব কোণের আমিশাপাড়া ইউনিয়নটি যৌথ ভাবে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ ও নাঙ্গলকোট উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত। ফলে ইউনিয়নের সীমান্ত ঘেঁষা কেন্দ্রগুলোতে সহিংসতা সৃষ্টির পর দ্রুত সীমানা অতিক্রমের আশঙ্কায় স্থানীয়রা।
তালিকায় উল্লেখিত কেন্দ্রের মধ্যে কুমিল্লার জেলার সীমানা ঘেষে রয়েছে চাষিরহাটের পোরকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সাহারপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কাবিলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র। যেগুলো সোনাইমুড়ী থানার ৫ থেকে ৮ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। এর মধ্যে প্রশাসনের তালিকায় কাবিলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঝুঁকিপূর্ণ ও পোরকরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর মধ্যে পূর্ববর্তী বিভিন্ন নির্বাচনে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে চারটি কেন্দ্রে। যেগুলো হচ্ছে সোনাইমুড়ী পৌরসভার বাটরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। নদনা ইউনিয়নের কালুয়াই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বজরা ইউনিয়নের ছনগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বারাহিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ মো. ছাইফ উল্যাহ গত ৩০ জানুয়ারী সাংবাদিকদের সাথে অনুষ্ঠিত একটি মতবিনিময় সভায় চাটখিল-সোনাইমুড়ীতে কর্মরত সাংবাদিকদের সামনে তাদের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকা উপস্থাপন করেন। সেখানে সোনাইমুড়ী পৌরসভা সহ ছয়টি ইউনিয়নের ১৯টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। যার মধ্যে সোনাইমুড়ী পৌরসভার পাপুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সোনাইমুড়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বাটরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। জয়াগ ইউনিয়নের জয়াগ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, মাহুতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, থানারহাট উচ্চ বিদ্যালয়। নদনা ইউনিয়নের পাঁচবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা আবু বকর ছিদ্দিক (রাঃ), জগজীবনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। চাষীরহাট ইউনিয়নের সাহারপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব কাঠালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বজরা ইউনিয়নের বজরা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, বারাহিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সোনাপুর ইউনিয়নের কালিকাপুর উচ্চ বিদ্যালয়, বারাহিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বদরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দেওটি ইউনিয়নের আমিরাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পিতাম্বরপুর উচ্চ বিদ্যালয়।
এদিকে নির্বাচন যতো ঘনিয়ে আসছে ততই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক। জনসভার মঞ্চ ছাপিয়ে উত্তেজনা ছড়াচ্ছে রাজপথে। শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারী) নদনা ইউনিয়নে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের কর্মীর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে বিএনপি কর্মীদের বিরুদ্ধে। তার আগে সোনাইমুড়ী পৌর এলাকায় জামায়াতের নারী কর্মীকে সড়কের ওপরে হেনস্তার একটি ভিডিও ছড়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তবে সংবাদ সম্মেলনে এসব ঘটনাকে সাজানো নাটক বলে দাবি করেছেন বিএনপি নেতারা। দল দুটির পাল্টাপাল্টি বক্তব্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে ভোটারদের মাঝে। যা তাদের মাঝে ভোটের দিনে সহিংসতার শঙ্কা বাড়াচ্ছে ।
তবে প্রশাসন বলছে, যে কোন ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুদ রয়েছে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্র সিসি ক্যমেরার আওতায় থাকবে। আনসার, বিজিবি, পুলিশ ও সেনাবাহিনীসহ কয়েক স্তরের নিরাপত্তার ব্যবস্থা রয়েছে। ভোটারদের যাতায়াতে বাধাঁ বা ভীতি প্রদর্শন ঠেকাতে রয়েছে বিশেষ টহল টিম। যে কোন কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে কাজ করবে সেনাবাহিনীর ‘কুইক রিআ্যকশন ফোর্স’। যারা মুহুর্তের মধ্যে পৌঁছে যাবে আক্রান্ত কেন্দ্রে। কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশের সাথে থাকবে বডিওর্ন ক্যামেরা ক্যামেরা। গত শনিবার (৩১ জানুয়ারী) সোনাইমুড়ীতে কর্মরত সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য তুলে ধরেন নোয়াখালীতে অবস্থানরত সেনাবাহিনীর উপ-অধিনায়ক মেজর রেজাউর রহমান বাপ্পি।
এছাড়া গত সোমবার (২ জানুয়ারি) থেকে মহাসড়কে সেনাবাহিনীর সুসজ্জিত মহড়া জনমনে সাময়িক স্বস্তি ফেরালেও ভোটের দিনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত প্রত্যন্ত গ্রামের নারী-পুরুষ ভোটারেরা। আধিপত্য বিস্তারে নদনা ইউনিয়নে দুই পক্ষের দেশীয় অস্ত্রের মহড়া, হামলা, লুটপাট ও গত ৫ আগস্ট থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার নিয়েও ধোঁয়াসায় রয়েছেন ভোটারেরা। সেসকল অবৈধ অস্ত্রগুলো নির্বাচনী সহিংসতায় ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কায় নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেকে।
আপনার মতামত লিখুন :