• ঢাকা
  • রবিবার, ১৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২রা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বিজয়ীর কাছে পরাজিতরা নিরাপদ থাকলে বিজয়ের আনন্দ মহিমান্বিত হয় – মোহাম্মদ হানিফ

জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। নির্বাচনের ফলাফল কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয় এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন। দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্তেজনা, সংঘাত, আন্দোলন এবং প্রতীক্ষার পর যদি জনগণের রায়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করেছেন, তবে এটি একটি দলের রাজনৈতিক সাফল্যের চেয়েও বড় বিষয়—এটি জনগণের প্রত্যাশা ও আস্থার প্রতিফলন। আর সেই প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন দলের শীর্ষ নেতা তারেক রহমান।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতির সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বিজয় কেমন হবে? প্রতিশোধের রাজনীতি, নাকি পুনর্মিলনের রাজনীতি? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়; পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও এই প্রশ্ন বারবার ফিরে এসেছে।

রাজনীতির সবচেয়ে বড় সত্য হলো ক্ষমতা কখনো স্থায়ী নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে বহু শক্তিশালী সরকার জনগণের আস্থা হারিয়ে পতনের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও একই বাস্তবতা দেখা গেছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা দল যদি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, যদি অহংকার ও ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু হয়, তবে জনগণ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সম্পর্কেও বিভিন্ন সময়ে এই আলোচনা উঠে এসেছে। গণতন্ত্রে জনগণই চূড়ান্ত শক্তি তারা যখন মনে করে পরিবর্তন প্রয়োজন, তখন তারা তাদের রায়ের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করে।

এই বাস্তবতা বিএনপির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। কারণ ইতিহাসে দেখা গেছে, যারা ক্ষমতায় এসে নিজেদের অপরাজেয় মনে করেছে, তারাই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমা ও সহনশীলতার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ পাওয়া যায় দক্ষিণ আফ্রিকা-তে। দীর্ঘ বর্ণবাদী শাসনের পর ক্ষমতায় এসে নেলসন ম্যান্ডেলা প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি। তিনি প্রতিশোধের পরিবর্তে জাতীয় পুনর্মিলনের পথ বেছে নিয়েছিলেন।

ম্যান্ডেলা নেতৃত্বাধীন আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস যদি প্রতিশোধের রাজনীতি শুরু করত, তবে দক্ষিণ আফ্রিকা গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারত। কিন্তু তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নয়, একসাথে বাঁচার জন্য। এই নীতির কারণেই দক্ষিণ আফ্রিকা রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীলতা অর্জন করে এবং বিশ্বে গণতন্ত্রের একটি উদাহরণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের জন্য এই শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গণতান্ত্রিক চর্চার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলো যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়। কিন্তু নির্বাচন শেষে বিজয়ী ও পরাজিত উভয় পক্ষ রাষ্ট্রীয় স্বার্থে একত্রে কাজ করার সংস্কৃতি বজায় রাখে।
মার্কিন ইতিহাসে গৃহযুদ্ধের সময়েও আব্রাহাম লিংকন বিজয়ের পর প্রতিশোধ নয়, পুনর্গঠনের নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত নীতি ছিল কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, সবার প্রতি সহমর্মিতা।এই দর্শন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও এই ধরনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিধ্বস্ত জার্মানি রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী নেতৃত্ব প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, জাতীয় পুনর্গঠনের পথে এগিয়ে যায়। তারা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে কাজ করে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে।

এই পুনর্গঠনের রাজনীতি জার্মানিকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিভাজন, সহিংসতা ও অবিশ্বাসের রাজনীতির মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, মামলা-মোকদ্দমা, রাজনৈতিক প্রতিশোধ এসব আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করেছে। আজ বিএনপি জনগণের আস্থায় ক্ষমতায় আসেছেন, তবে তাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো এই সংস্কৃতি পরিবর্তন করা। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দলটি টিকে রয়েছে এমন ধারণা জনগণের একটি অংশের মধ্যে রয়েছে।
এই ধৈর্য ও বিনয়ের রাজনীতি যদি সত্যিই জনগণের সমর্থন এনে থাকে, তবে সেই মূল্যবোধ ধরে রাখা এখন বিএনপির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

গণতন্ত্রে বিরোধী দল রাষ্ট্রের শত্রু নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার। সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে সরকার কার্যকর হয় না। সমালোচনা শাসনব্যবস্থাকে শুদ্ধ করে, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বা অন্যান্য রাজনৈতিক দল যদি নির্বাচনে পরাজিত হয়, তবে তাদের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা বিজয়ী দলের নৈতিক দায়িত্ব।
বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে ক্ষমতা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত। জনগণের ভোটের মাধ্যমে এই আমানত রাজনৈতিক নেতাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
ইতিহাসে দেখা গেছে, যখন শাসকরা এই আমানতের মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে, তখন তাদের পতন ঘটেছে। তাই ক্ষমতায় এসে আত্মসংযম ও বিনয় বজায় রাখা রাজনৈতিক নেতৃত্বের অন্যতম দায়িত্ব।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা। তাঁর নেতৃত্বে সরকার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে পাঁচ বছরের জন্য, তবে প্রথম বার্তাই হওয়া উচিত দেশ গড়তে সবাইকে প্রয়োজন।

নেতৃত্বের ভাষা তৃণমূল রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। যদি নেতৃত্ব সহনশীলতার বার্তা দেয়, তবে রাজনৈতিক কর্মীরাও তা অনুসরণ করবে। এতে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা কমবে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়বে। বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দুর্নীতি দমন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় রাজনৈতিক ঐক্য অপরিহার্য।
একটি দল একা রাষ্ট্র পরিচালনার সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব তখনই, যখন সব রাজনৈতিক দল জাতীয় স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন প্রয়োজন নতুন সংস্কৃতি। যেখানে নির্বাচন শেষে প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করা হবে না। হামলা, মামলা বা সামাজিকভাবে হেয় করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। বরং নির্বাচন শেষে সৌজন্য সাক্ষাৎ, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং সহাবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এতে জনগণের মধ্যে রাজনীতির প্রতি আস্থা বাড়বে।গণতন্ত্রে পরাজয় মানে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া নয়। বরং এটি নতুনভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ। পৃথিবীর ইতিহাসে বহু রাজনৈতিক দল পরাজয়ের পর নিজেদের পুনর্গঠন করে আবার ক্ষমতায় এসেছে।পৃথিবীর ইতিহাস সাক্ষী রইল তার মধ্যে বিএনপি একটি উদাহরণ। তাই পরাজিত দলগুলোরও দায়িত্ব গঠনমূলক বিরোধিতায় অংশ নেওয়া এবং বিকল্প নীতি প্রস্তাব করা।

রাজনীতির ইতিহাস প্রমাণ করে প্রতিশোধের রাজনীতি কখনো স্থায়ী শান্তি আনে না। ক্ষমতা পরিবর্তনের চক্র চলতেই থাকবে। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি যদি সহনশীলতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে, তবে রাষ্ট্র স্থিতিশীল হবে।
বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। যদি বিজয়ী দল উদারতা দেখায়, যদি পরাজিত দল গঠনমূলক বিরোধিতায় বিশ্বাস রাখে, তবে এই নির্বাচন একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে পারে।সবশেষে আবারও বলা যায়

বিজয়ীর কাছে পরাজিতরা নিরাপদ থাকলে বিজয়ের আনন্দ মহিমান্বিত হয়।
এই নীতি অনুসরণ করেই বাংলাদেশ সত্যিকারের উন্নয়ন ও শান্তির পথে এগিয়ে যেতে পারে। সবার অংশগ্রহণে, সবার সম্মানে, সবার নিরাপত্তায় গড়ে উঠতে পারে সেই কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলা।আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই শিক্ষা উপলব্ধি করার তৌফিক দান করুন আমিন।

লেখক : স্টাফ রিপোর্টা, দৈনিক নোয়াখালীর কথা

আরও পড়ুন