• ঢাকা
  • রবিবার, ১৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২রা ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট : ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশা ও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের প্রশ্ন – মোহাম্মদ হানিফ

রাষ্ট্র কেবল একটি মানচিত্র নয় এটি একটি নৈতিক অঙ্গীকার। জনগণ ভোট দেয়, সরকার গঠিত হয় কিন্তু গণতন্ত্র টিকে থাকে তখনই, যখন সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই রাষ্ট্রকে নিজেদের যৌথ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে। প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ  আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ছাড়া টেকসই স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়।

দীর্ঘদিন পর কোনো দল বা নেতৃত্ব ক্ষমতায় এলে সাধারণত দুটি প্রবণতা দেখা যায় প্রথমত, প্রতিশোধমূলক রাজনীতি দ্বিতীয়ত, প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের সুযোগ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে দেশগুলো দ্বিতীয় পথ বেছে নিয়েছে, তারাই দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে।

যুক্তরাজ্য এ কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টির মধ্যে বহুবার ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতায় এসে বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করার সংস্কৃতি সেখানে নেই। সংসদীয় কমিটি, প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং নীতিগত বিতর্কের মাধ্যমে সরকারকে নিয়মিত জবাবদিহির মধ্যে রাখা হয়। দীর্ঘ বিরতির পর ক্ষমতায় এলেও তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ভেঙে না দিয়ে সংস্কার করে।

ভারত এ ২০১৪ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি দীর্ঘ সময় পর পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। প্রশাসনিক পরিবর্তন এসেছে, নীতিগত রদবদল হয়েছে কিন্তু বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও সাংবিধানিক কাঠামো টিকে আছে। রাজনৈতিক বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে এটাই বড় শিক্ষা।

জাপান এ দীর্ঘ সময় বিরোধী থাকার পর লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি পুনরায় ক্ষমতায় আসে। কিন্তু উন্নয়ন পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা ভাঙা হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখা হয়েছে।
জার্মানি-এ বহুবার জোট সরকার গঠিত হয়েছে। ক্ষমতায় এসে প্রতিপক্ষকে সম্পূর্ণ বাদ না দিয়ে গ্র্যান্ড কোয়ালিশন গঠন করা হয়েছে। এতে রাজনৈতিক মেরুকরণ কমেছে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বেড়েছে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সংস্কৃতি জয়-পরাজয় কেন্দ্রিক। বিজয় মানেই একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ, পরাজয় মানেই কোণঠাসা হওয়া এই ধারণা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। একটি পরিপক্ব গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী দল ফ্রিকশনাল সম্পর্ক নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রাখে। মতভেদ থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রশ্নে ন্যূনতম ঐকমত্য থাকবে।

বিরোধী দলকে বলা হয় লয়্যাল অপোজিশন অর্থাৎ তারা সরকারের বিরোধিতা করলেও রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত। এই ধারণা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে শত্রুতায় রূপ নিতে দেয় না।
বাংলাদেশেও প্রয়োজন. সংসদে প্রাণবন্ত বিতর্ক,বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা. নীতি নির্ধারণে সর্বদলীয় আলোচনা.নির্বাচন ব্যবস্থায় আস্থার পুনর্গঠন!

ধরা যাক, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও প্রতিকূলতার পর কোনো নেতৃত্ব বা দল বিপুল সমর্থনে ক্ষমতায় এসেছে। ইতিহাস বলে, এই মুহূর্তটি সবচেয়ে সংবেদনশীল। কারণ জনসমর্থন যত বড়, প্রত্যাশাও তত বিশাল।
যদি দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়েছেন তাহলে তার সামনে থাকবে দ্বিমুখী পথ। অতীতে তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন এটি সমর্থকদের আবেগকে তীব্র করতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রনায়কের পরিচয় নির্ধারিত হয় প্রতিশোধে নয়, সংযমে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নয়, অন্তর্ভুক্তিতে।
বিশাল বিজয় কেবল রাজনৈতিক স্বীকৃতি নয়; এটি একটি নৈতিক দায়বদ্ধতা। এই বিজয়কে কেন্দ্র করে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হয়।

দীর্ঘ বিরতির পর ক্ষমতায় আসা তারেক রহমানের  বড় পরীক্ষা হলো তিনি কি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করবে, নাকি পেশাদারিত্ব বাড়াবে? দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান নিয়ে প্রশাসনিক পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করবরন।  নাকি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও প্রশাসনিক দক্ষতা অক্ষুণ্ণ রাখা হবে। সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে রূপান্তরের পর দীর্ঘমেয়াদি শিল্পনীতি ধরে রাখবেন।  নাকি ফলে প্রযুক্তি ও রপ্তানিতে অগ্রগতি অব্যাহত রাখবেন।

বাংলাদেশেও অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ডিজিটাল রূপান্তর এসব খাতে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা জরুরি। ক্ষমতার পরিবর্তন যেন উন্নয়ন পরিকল্পনার পরিবর্তন না হয়ে যায়। দীর্ঘস্থায়ী গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন একটি নতুন রাজনৈতিক চুক্তি১. সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের নেতৃত্ব২. গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে সর্বদলীয় পরামর্শ।
৩. নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান৪. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ৫. তরুণ প্রজন্মকে নীতিনির্ধারণে সম্পৃক্ত করা। গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন পরাজিতরাও নিরাপদ বোধ করেন। বিজয় তখনই মহিমান্বিত হয়, যখন বিজয়ীরা উদার হন। তারেক রহমান যদি তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন , তাহলে তার সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ হবে রাজনীতির ভাষা পরিবর্তন করা। প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে তিনি যদি জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানান, বিরোধী দলকে সংলাপে ডাকেন, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করেন তবে এটি হবে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

রাজনীতির ইতিহাসে এমন মুহূর্ত খুব কম আসে, যখন ব্যক্তিগত কষ্ট ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার স্মৃতি অতিক্রম করে জাতীয় নেতৃত্বে পরিণত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে নেতৃত্ব ইতিহাসে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন ।দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ক্ষমতা পাওয়া পর ; কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী গণতন্ত্র গড়ে তুলতে লাগে সংযম, দূরদর্শিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর আমরা কি প্রতিশোধের চক্রে আবদ্ধ থাকব, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণের পথে হাঁটব?১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশা একটাই একটি অংশগ্রহণমূলক, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র।রাষ্ট্র কোনো এক দলের নয়এটি সবার।

এই সত্য উপলব্ধি করতে পারলেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অর্জিত ক্ষমতা রূপ নেবে দীর্ঘস্থায়ী গণতন্ত্রে।  আল্লাহ তায়ালার কাছে সাহায্য এবং প্রার্থনা করছি তিনি যেন বাংলাদেশের বর্তমান  রাষ্ট্র নায়ক তারেক রহমানকে কথাগুলোর উপরে চলার তৌফিক দান করেন।

লেখক : স্টাফ রিপোর্টা, দৈনিক নোয়াখালীর কথার

আরও পড়ুন